রবিউল আউয়াল আরবি হিজরি চান্দ্রমাসের তৃতীয় মাস। ‘রবি’ অর্থ বসন্ত, ‘আউয়াল’ মানে প্রথম; রবিউল আউয়াল হলো আরব বসন্তের প্রথম মাস বা প্রথম বসন্ত। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, সারা বিশ্বের বিস্ময়, আখেরি নবী ও সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। এই মাসে তিনি আপন প্রিয় জন্মভূমি মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন, যেখান থেকে হিজরি সনের উৎপত্তি। আর সর্বশেষ তিনি রবিউল আউয়াল মাসেই ইন্তেকাল করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

এ দিবস মুসলিম সমাজে ‘ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম’ নামে পরিচিত। ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম কথাটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। দোয়াজদাহম মানে বারো। ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম অর্থ হলো বারো তারিখের ফাতিহা অনুষ্ঠান। কালক্রমে এদিন মিলাদুন নবী (সা.) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এর অর্থ হলো নবী (সা.)–এর জন্মানুষ্ঠান। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ‘ঈদ’ শব্দ যোগ হয়ে ‘ঈদে মিলাদুন নবী (সা.)’ রূপ লাভ করে, যার অর্থ হলো মহানবী (সা.)–এর জন্মোৎসব। এ পর্যায়ে আরেকটি পরিভাষাও প্রচলিত হতে থাকে। সেটি হলো ‘সিরাতুন নবী (সা.)’ অর্থাৎ নবী (সা.)–এর জীবনচরিত বা জীবনী আলোচনা অনুষ্ঠান। এ দিবসে অনেকে জশনে জলুশ বা শোভাযাত্রা ও আনন্দ র‍্যালিও করে থাকেন।

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। নবী–রাসুল প্রেরণের লক্ষ্য হলো, মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাই আল্লাহকে পেতে রাসুল (সা.)–এর পথ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ রাসুল (সা.) যা যা করেছেন বা করতে বলেছেন, তা করতে হবে

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পরিচয় লাভ করা। নবী–রাসুল প্রেরণের লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাই আল্লাহকে পেতে রাসুল (সা.)–এর পথ অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ রাসুল (সা.) যা যা করেছেন বা করতে বলেছেন, তা করতে হবে। আর যা করেননি বা করতে বারণ করেছেন, তা বর্জন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, ‘যা দিয়েছেন তোমাদের রাসুল (সা.) তা ধারণ করো; আর যা বারণ করেছেন, তা হতে বিরত থাকো।’ (সুরা-৫৭ হাশর, আয়াত: ৭) আরও বলা হয়েছে, ‘বলুন (হে রাসুল (সা.) যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসবে, তবে আমার অনুকরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সুরা-৩ আল–ইমরান, আয়াত: ৩১)

হাদিস শরিফে আছে, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা–পুত্র ও যাবতীয় সবকিছু হতে প্রিয় হব।’ (বুখারি, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ১৩ ও ১৪)

এ আলোকে নিশ্চিত করে বলা যায়, রাসুল (সা.)–এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের পূর্বশর্ত। আর এ ভালোবাসা তাঁর নির্দেশ পালন ও অনুকরণের মাঝেই প্রকাশ পাবে। সিরাত শব্দের অর্থ হলো জীবনচরিত বা জীবনাদর্শ। সিরাতুন নবী (সা.) মানে হলো মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর জীবন ও কর্ম আলোচনা, পর্যালোচনা ও চর্চা বা অনুশীলন করা এবং তা প্রচার–প্রসারে ব্রতী হওয়া।  মিলাদুন নবী (সা.)–এর মূল শিক্ষা হলো কালেমা তাইয়েবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, অর্থাৎ ‘আল্লাহ ভিন্ন উপাস্য নাই, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রেরিত রাসুল।’ এ কালেমার নিগূঢ় অর্থ হাজারো প্রকারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, এর মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অথচ অতি সংক্ষিপ্ত ও অতি নিখুঁত বিশ্লেষণ হলো ‘বিশ্ব প্রভু আল্লাহর প্রতি আমি ইমান আনলাম, তাঁর সব আদেশাবলি মেনে নিলাম।’ (ইমানে মুজমাল)

মিলাদুন নবী (সা.)–এর আসল শিক্ষা হলো মহানবী (সা.)–এর ভালোবাসার, কঠোর সাধনার, দাঁত ভাঙা, রক্ত ঝরা, পরিপূর্ণ ও একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম বা জীবন বিধান ইসলামকে পূর্ণাঙ্গরূপে সর্বস্তরে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব আল্লাহদ্রোহী শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নাস্তানাবুদ করে দিয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করা। আর এটাই নবী বা রাসুল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য; যা পবিত্র কোরআনে বারবার বিবৃত হয়েছে, ‘তিনি সে মহান প্রভু, যিনি রাসুল প্রেরণ করেছেন, সঠিক পন্থা ও সত্য ধর্ম সহযোগে, যাতে সে ধর্মকে প্রকাশ করতে পারেন সর্ব ধর্মের শিখরে, যদিও কাফির-মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সুরা-৯ তওবা, আয়াত: ৩৩)

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]