নীল নদ আর পিরামিডের দেশ মিসর। রমজান এলেই মিসরের বুক চিরে বয়ে যায় এক আধ্যাত্মিক আর সাংস্কৃতিক জোয়ার। মিসরিদের কাছে রমজান মানে ‘ফানুস’, ‘মাদফা’ (ইফতারের কামান) আর পাড়া-পড়শির সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এক দীর্ঘ দস্তরখানের গল্প।
ইফতারের কামান ও ফানুস উৎসব
মিসরে ইফতারের সময় ঘড়ি দেখে নয়, বরং কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে জানানো হয়। কায়রোর ঐতিহাসিক সালাহউদ্দিন দুর্গের ওপর থেকে যখন কামানের গর্জন শোনা যায়, তখনই পুরো শহর একসঙ্গে ইফতার শুরু করে
এই প্রথাটি ‘মাদফা আল-ইফতার’ নামে পরিচিত।
পাশাপাশি, মিসরের রমজানের প্রতীক হলো ‘ফানুস’ বা রঙিন লণ্ঠন। ফাতেমীয় আমল থেকে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও অম্লান। রমজানে মিসরের প্রতিটি রাস্তা, বাড়ি আর মসজিদের সামনে রঙিন কাঁচ আর ধাতুর তৈরি বাহারি লণ্ঠন ঝোলানো হয়।
শিশুরা হাতে ছোট ছোট লণ্ঠন নিয়ে ‘ওয়াহওয়াই ইয়া ওয়াহওয়াই’ গান গাইতে গাইতে রাস্তায় মিছিল করে।
‘মাতারিয়া’র মহাদস্তরখান
কায়রোর উত্তর-পূর্বের এলাকা ‘মাতারিয়া’র ইফতার এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। এখানে গত ১১ বছর ধরে (করোনা বাদে) আয়োজন করা হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বড় গণ-ইফতার। মাতারিয়া এলাকার বাসিন্দারা কয়েকশ মিটার লম্বা দস্তরখান সাজান। হাজারো মানুষ একসঙ্গে বসে এখানে ইফতার করেন।
মজার ব্যাপার হলো, এই বিশাল খাবারের আয়োজন কেবল কোনো সংস্থা নয়, বরং পাড়ার প্রতিটি ঘরের নারীরা বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে আসেন। এখানে মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানরাও খাবার তৈরিতে আর পরিবেশনায় হাত মেলান।
ইফতারিতে যা থাকে
মিসরিদের ইফতার শুরু হয় এক গ্লাস ঐতিহ্যবাহী শরবত দিয়ে। তাদের ইফতারের প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
কামার আল-দীন: শুকনা খুবানি বা অ্যাপ্রিকট দিয়ে তৈরি বিশেষ শরবত। এটি মিসরি ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ফূল মাদামেস: শিমের ডাল দিয়ে তৈরি এই খাবারটি ইফতার ও সাহরি দুই সময়েই খুব জনপ্রিয়।
কুনাফা ও কাতায়েফ: ময়দার খামির দিয়ে তৈরি ‘কুনাফা’ আর হিলাল বা চাঁদের আকৃতিতে তৈরি ‘কাতায়েফ’ মিসরের সিগনেচার রমজান ডেজার্ট। এগুলো ছাড়া মিসরিদের ইফতার পূর্ণ হয় না।
আচার: মিসরিরা বিশ্বাস করে টক-ঝাল আচার তাদের ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে কাজ করে, তাই দস্তরখানে এক বাটি রঙিন আচার থাকা চাই-ই চাই।
‘ডিশ পার্টি’র নতুন ধারণা
বর্তমানে মিসরের মুদ্রাস্ফীতি আর আর্থিক টানাপড়েন তাদের চিরচেনা রমজানে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তারা এখন নতুন নতুন সাশ্রয়ী পদ্ধতি বের করেছেন।
ডিশ পার্টি: অনেক পরিবার এখন রেস্তোরাঁয় না গিয়ে পার্কে বা নীল নদের পাড়ে ‘ডিশ পার্টি’ করে। এখানে প্রতিটি পরিবার একটি করে পদ বাড়ি থেকে রান্না করে আনে, ফলে খরচ কম হয় কিন্তু পুনর্মিলনটা ঠিকই বজায় থাকে।
নীল নদের নৌকা: অল্প খরচে নীল নদের ছোট নৌকা বা ফেলুকায় বসে ইফতার করা এখন তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়।
অমুসলিমদের শ্রদ্ধা
মিসরের রমজানে এক অপূর্ব দৃশ্য হলো অমুসলিমদের অংশগ্রহণ। কায়রোতে একটি খ্রিষ্টান পরিবার কয়েক দশক ধরে ইফতারের জন্য কুনাফা ও কাতায়েফ বিক্রি করে আসছেন।
তারা কেবল ব্যবসাই করেন না, বরং পুরো মাস মুসলিমদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। অনেক অমুসলিম মিসরি রমজানে প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকেন এবং ইফতারের সময় মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে দস্তরখানে যোগ দেন।
সূত্র: আল–জাজিরা ডটনেট