আল-আত্তারিন: যে মাদ্রাসা গরিব ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিত
মরক্কোর ফেজ শহরের সুগন্ধি বাজার সুক আল-আত্তারিনের ঠিক পাশে একটা সাদামাটা দরজা। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী লুকিয়ে আছে।
কিন্তু সেই দরজা পেরিয়ে উঠানে পা রাখলেই চমক লাগে—মেঝে থেকে দেয়াল, সবখানে জেলিজ মোজাইক আর তার ওপরে খোদাই করা স্টাকোর কারুকাজ, যা মারিনিদ স্থাপত্যের সবচেয়ে পরিশীলিত নমুনাগুলোর একটা বলে গণ্য করা হয়। (জর্জ মার্সাইস, লার্কিতেকতুর মুসুলমান দ’অক্সিদঁ, পৃষ্ঠা: ২৮৮-২৮৯, পারি: আর্তস এ মেতিয়ে গ্রাফিক, ১৯৫৪ খ্রি. )
এই হলো আল-আত্তারিন মাদ্রাসা—আকারে বেশি বড় নয়, কিন্তু এর গল্প ফেজের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৩২৩ থেকে ১৩২৫ সালের মধ্যে মারিনিদ সুলতান আবু সাইদ উসমান ফেজের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র ‘কারাউইয়িন’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে গা ঘেঁষে এই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। (ইয়ানিক লিন্ৎস, মারোক মেদিয়েভাল: আঁ অম্পির দ্য লাফরিক আ লেসপান্য, পৃষ্ঠা: ৪৮৬, পারি: লুভ্র এদিসিওঁ, ২০১৪ খ্রি. )
ছাত্রদের অধিকাংশই ছিল গরিব ঘরের সন্তান—নিজের শহরে ফিরে গিয়ে একটা সম্মানজনক অবস্থান পাওয়ার আশায় তারা এখানে পড়াশোনা করতেন, আর মাদ্রাসা তাদের থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করত।
কেন কারাউইয়িনের পাশে
মরক্কোর কারাউইয়িন বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। তবে কারাউইয়িন নিজে কোনো ছাত্রাবাস রাখত না। ফেজের বাইরে থেকে যারা পড়তে আসত, বিশেষ করে তাঞ্জিয়ার, লারাশ বা কসর এল-কেবিরের মতো উত্তর-পশ্চিম মরক্কোর শহর থেকে আসা ছাত্ররা, তাদের থাকার জায়গা নিয়ে একটা সংকট ছিল।
তখন আল-আত্তারিন আর তার আশপাশের সাফারিন, মেসবাহিয়ার মতো মাদ্রাসাগুলো সেই শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে আসে। কেননা, এগুলো ছিল কারাউইয়িনের সহায়ক প্রতিষ্ঠান, ফলে এই সকল মাদ্রাসায় দূর-দূরান্তের ছাত্ররা থাকা আর খাওয়ার ব্যবস্থা পেত। (রজার লে তুর্নো, কাসাব্লাঙ্কা: সোসিয়েতে মারোকেন দ্য লিব্রেরি এ দেদিসিওঁ, ১৯৪৯ খ্রি.)
ছাত্রদের অধিকাংশই ছিল গরিব ঘরের সন্তান—নিজের শহরে ফিরে গিয়ে একটা সম্মানজনক অবস্থান পাওয়ার আশায় তারা এখানে পড়াশোনা করতেন, আর মাদ্রাসা তাদের থাকা–খাওয়ার ব্যবস্থা করত। (রিচার্ড পার্কার, আ প্র্যাক্টিকাল গাইড টু ইসলামিক মনুমেন্টস ইন মরক্কো, পৃষ্ঠা: ১৩৬-১৩৯, শার্লটসভিল: দ্য বারাকা প্রেস, ১৯৮১ খ্রি. )
সম্পদ নয়, জ্ঞানই ছিল তাদের ভবিষ্যতের পথ। নবীজির (সা.) একটা কথা এখানে যেন এই বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি—আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী, আর তারা দিনার-দিরহাম রেখে যান না, রেখে যান জ্ঞান। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৮২)
আল-আত্তারিনের ছাত্রকুঠুরিতে থাকা সেই গরিব তরুণদের জন্য এই কথাটা শুধু তত্ত্ব ছিল না, ছিল তাদের জীবনের বাস্তব হিসাব।
তবে আল-আত্তারিন শুধু আশ্রয়দাতা বা কারাউইয়িনের নিছক বিশ্রামাগার ছিল না, একটা স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল। এখানে নিজস্ব ক্লাসও চলত। সেকালের আলেমদের অনেকে এই মাদ্রাসায় পড়িয়েই নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। (আত্তিলিও গাউদিও, ফেস: জোয়ো দ্য লা সিভিলিজাসিওঁ ইসলামিক, পারি: ইউনেসকো প্রেস ও নুভেল এদিসিওঁ লাতিন, ১৯৮২)
সুলতানের রাজনৈতিক বিনিয়োগ
মারিনিদ সুলতানরা যে এত মাদ্রাসা গড়েছিল, তার পেছনে যে শুধু জ্ঞানপ্রীতি ছিল তা নয়। আগের আলমোহাদ শাসকদের ধর্মীয় ধারাকে সুন্নি মুসলিমরা মেনে নিতে চায় নি, ফলে মারিনিদরা ক্ষমতা পেয়ে সেই সুযোগ গ্রহণ করেন। তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেরন প্রকৃত সুন্নি অর্থোডক্সির রক্ষক হিসেবে।
মাদ্রাসা ছিল এই ভাবমূর্তি গড়ার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার, যা একই সঙ্গে ফেজের স্বাধীনচেতা আলেমসমাজের সমর্থন লাভ করেছে, আবার প্রশাসন চালানোর মতো দক্ষ লোকবলও তৈরি করেছে। (জর্জ মার্সাইস, লার্কিতেকতুর মুসুলমান দ’অক্সিদঁ, পৃষ্ঠা: ২৮৮)
জানা যায়, সুলতান আবু সাইদ নিজে স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দেখেছিলেন, আর নির্মাণের তদারকিতে ছিলেন ১৪ শতকের খ্যাতিমান স্থপতি শেখ বনি আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবনে কাসিম আল-মিজওয়ার (আত্তিলিও গাউদিও, ফেস: জোয়ো দ্য লা সিভিলিজাসিওঁ ইসলামিক)
সীমিত জায়গায় বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান
স্থপতিদের জন্য জায়গাটা ছিল চ্যালেঞ্জিং—শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় গড়ে তোলা এই মাদ্রাসার দিক কিবলার সঙ্গে সরাসরি মিলছিল না, যেমনটা সাধারণত মারিনিদ মাদ্রাসাগুলোতে হতো।
সমস্যা সমাধানে স্থপতিরা মিহরাবকে প্রধান অক্ষের সঙ্গে লম্বভাবে প্রার্থনাকক্ষের একপাশে বসিয়ে দেন, আর তিন-আর্চের একটা গ্যালারি দিয়ে তার ওপর একটা চতুষ্কোণ কাঠের গম্বুজ তুলে দেন।
সীমিত জায়গার মধ্যে এমন মার্জিত একটা সমাধান মারিনিদ স্থপতিদের কারিগরি দক্ষতারও প্রমাণ বহন করে। (নাতাশা কুবিশ, ইসলাম: আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার, পৃষ্ঠা: ৩১৩, এইচ.এফ. উলমান, ২০১১ খ্রি. )
আজকের আল-আত্তারিন
১৯১৫ সাল থেকে এই মাদ্রাসা মরক্কোর সরকারি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় আছে। এখন আর সেখানে ছাত্রাবাস নেই। মূল নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটা একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে।
সাত শতক আগে যে গরিব তরুণেরা এই কুঠুরিগুলোতে থেকে জ্ঞানের খোঁজে এসেছিল, তাদের কেউই হয়তো ইতিহাসে নাম রেখে যায়নি। কিন্তু ঐতিহ্য আজও এই শহরকে আলাদা করে রাখছে।
ফরাসি শাসনামলে (১৯১২-১৯৫৬) আইন অনুযায়ী এখনও সেখানকার মসজিদ বা মাদ্রাসায় অমুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই বিদেশি দর্শনার্থীরা শুধু উঠান পর্যন্তই যেতে পারেন।