সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে নিজের চরিত্র, যোগ্যতা কিংবা কর্মস্পৃহা বাড়াতে আগ্রহী নন, কিন্তু তাঁর পরিবার কতটা সম্ভ্রান্ত ছিল কিংবা পূর্বপুরুষের সমাজে কী প্রতিপত্তি ছিল—সেটি নিয়ে গর্বের শেষ নেই।
ব্যক্তিমানুষের এই অহংকার শুধু সামাজিক জীবনেই নয়, ধর্মীয় ও পারিবারিক চিন্তাতেও এক বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি করে। মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে যে তার রক্তে কোনো মহান ব্যক্তির ধারা বইছে বলেই সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পার পেয়ে যাবে বা মর্যাদাবান হবে, তখনই তার নৈতিক ও আত্মিক অবক্ষয় শুরু হয়।
ইসলামি জীবনদর্শনে ব্যক্তির এই মানসিকতাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কোরআন মানবজাতিকে শিখিয়েছে যে, প্রতিটি মানুষকে তার নিজের কাজের জন্যই জবাবদিহি করতে হবে; অন্যের সাফল্য দিয়ে নিজের আমলনামা ভারী করা যায় না। সুরা বাকারার ১৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ–তাআলা এই শাশ্বত নিয়মকে এক অনন্য ও কালজয়ী বাক্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।
যদি কেউ মহৎ বংশের পাশাপাশি সত্যের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রাখে, তবে তা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি সে শুধু বংশের দোহাই দেয় এবং ন্যায়নীতি বিসর্জন দেয়, তবে সেই বংশপরিচয় আল্লাহর বিচারে কোনো মূল্য বহন করে না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বংশমর্যাদার ভ্রান্তি
পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “তারা ছিল এক উম্মত, যারা অতীত হয়ে গেছে; তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের জন্য এবং তোমরা যা অর্জন করেছ তা তোমাদের জন্য; আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদের কোনো প্রশ্ন করা হবে না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৪)।
এই আয়াতটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানা যায়, নবীজির আগমনের সময় মদিনার ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নিজেদের হজরত ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক ও ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধর বলে অহংকার করত।
তারা ভাবত, যেহেতু তারা মহান নবীদের রক্ত বহন করছে, তাই তাদের আকিদা-বিশ্বাস বা আচরণে যতই ত্রুটি থাকুক না কেন, শেষপর্যন্ত তারাই একমাত্র হেদায়েতপ্রাপ্ত দল। এমনকি নবী ইব্রাহিমের রেখে যাওয়া সুনাম ও পুণ্যকে তারা নিজেদের একচেটিয়া সম্পদ বানিয়ে ফেলেছিল।
তাদের এই অলীক ধারণা খণ্ডন করতে গিয়ে কোরআন স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে অতীতের মানুষের আমল তাদের নিজেদের পাওনা, আর বর্তমান প্রজন্মের প্রাপ্তি নির্ভর করবে তাদের নিজেদের অর্জনের ওপর।
তাফসিরবিদ মুহাম্মদ আবু জাহরা লিখেছেন, “ইহুদিরা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর সন্তানদের কোনো মহৎ গুণ উচ্চারিত হলেই তা নিজেদের দিকে টেনে নিত এবং অন্যদের ওপর অহংকার করত।
তারা মনে করত যে তারা হেদায়েতের ওপর আছে, যদিও তারা নবীদের আদর্শ অনুসরণের ধার ধারত না। আল্লাহ তাদের এই অহংকার চূর্ণ করে বুঝিয়ে দিলেন যে শুধু রক্ত বা বংশের সম্পর্ক মানুষকে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান করে না; বরং মর্যাদা অর্জন করতে হলে নবীদের রেখে যাওয়া একনিষ্ঠ তাওহীদের আদর্শ অনুসরণ করতে হয়।” (মুহাম্মদ আবু জাহরা, জাহরাতুত তাফাসির, ১/৪২০, দারুল ফিকর আল-আরাবি, কায়রো, ২০০৮)
বংশের শরাফতি নাকি আদর্শের অনুসরণ
মানুষের সম্মান ও মর্যাদা মূলত দুটি উপাদানের ওপর নির্ভর করতে পারে—প্রথমত, বংশের মর্যাদা (শরাফাতে নসব) এবং দ্বিতীয়ত, আদর্শ অনুসরণের মর্যাদা (শরাফাতে ইত্তিবা)।
যদি কেউ মহৎ বংশের পাশাপাশি সত্যের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রাখে, তবে তা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি সে শুধু বংশের দোহাই দেয় এবং নিজের কর্মজীবনে সত্য ও ন্যায়নীতিকে বিসর্জন দেয়, তবে সেই বংশপরিচয় আল্লাহর বিচারে কোনো মূল্য বহন করে না।
সাল্লাবি তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, “যদি তোমরা নবী ইব্রাহিমের প্রকৃত উত্তরসূরি হওয়ার দাবি করো, তবে তোমাদের উচিত তাঁর সুমহান উপদেশ মেনে চলা এবং একমাত্র এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা। তবেই তোমাদের বংশের মর্যাদা এবং আদর্শ অনুসরণের শরাফতি একসাথে যুক্ত হবে।
কিন্তু আদর্শের অনুসরণ ছাড়া শুধু বংশের নাম ভাঙিয়ে চলা একেবারেই নিরর্থক। ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু অতীতের গৌরব দিয়ে নিজেদের পাপাচার ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।” (আস-সাল্লাবি, ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, পৃষ্ঠা: ১৪৫, দার ইবনে কাসির, দামেস্ক, সিরিয়া, ২০০৪)
অপরের পুণ্য দিয়ে যেমন নিজেকে পুণ্যবান দাবি করা যায় না, তেমনি অপরের অপরাধের ভারও কেউ বহন করে না।
'তাদের অর্জন তাদের, তোমাদের অর্জন তোমাদের'
কোরআনের চিরন্তন বাক্য “লাহা মা কাসাবাত ওয়া লাকুম মা কাসাবতুম”। এখানে ‘কাসাব’ বা ‘অর্জন’ শব্দটি দিয়ে মানুষের স্বাধীনতা এবং তার কাজের ফলাফলকে নির্দেশ করা হয়েছে। মহাজাগতিক বিচারে প্রতিটি মানুষের হিসাব হবে সম্পূর্ণ পৃথক।
আয়াতটির ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, “লাহা মা কাসাবাত” বাক্যাংশটি অতীত জাতির সমস্ত ভালো কাজের শুভ প্রতিদানকে শুধু তাদের জন্যই নির্ধারিত করার ঘোষণা দেয়।
অন্যদিকে “ওয়া লাকুম মা কাসাবতুম” কথাটির মাধ্যমে বর্তমান যুগের মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে যে, তোমরা যদি পূর্বসূরিদের মতো সৎকাজ করো, তবেই তাদের মতো পুণ্য পাবে; আর যদি পাপাচার ও কুফরিতে লিপ্ত হও, তবে তার কঠিন মাশুল তোমাদেরই গুণতে হবে।
কোরআনের এই অংশের শেষ বাক্যটি মানুষের দায়িত্ববোধকে আরও বাড়িয়ে দেয়, ‘আর তারা যা করত সে সম্পর্কে তোমাদের কোনো প্রশ্ন করা হবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩৪)
কাল কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কোনো মানুষকে জিজ্ঞাসা করবেন না যে তাঁর পূর্বপুরুষরা কী ভালো কাজ করেছিলেন। একইভাবে পূর্বপুরুষের অপরাধের দায়ও অন্যায্যভাবে উত্তরসূরির ওপর চাপানো হবে না।
কোরআনের এই নীতি মানুষের কাঁধ থেকে অযথা অতীতের বোঝা নামিয়ে দেয় এবং তাকে নিজের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। অপরের পুণ্য দিয়ে যেমন নিজেকে পুণ্যবান দাবি করা যায় না, তেমনি অপরের অপরাধের ভারও কেউ বহন করে না।
ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা দাবি করত যে তাদের ধর্মে আবদ্ধ থাকাই হলো হেদায়েতের একমাত্র পথ। অথচ তারা সত্যের মূল রূপ পরিবর্তন করে ফেলেছিল।
মিল্লাতে ইব্রাহিম: সত্যের আসল পরিমাপক
নবী ইব্রাহিমের ধর্মের মূল বার্তা হলো একনিষ্ঠ তাওহিদ এবং যাবতীয় পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকা। এটিই হলো সত্যের আসল পরিমাপক। প্রাচীন আহলে কিতাবগণ যখন সত্যের মূল উৎস থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের প্রথাগুলো একমাত্র সত্য বলে দাবি করতে শুরু করল, তখন তারা মূলত ইব্রাহিমি আদর্শ থেকেই দূরে সরে গেল।
অধ্যাপক আবু জাহরা এ প্রসঙ্গে আরও আলোচনা করে লিখেছেন, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা দাবি করত যে তাদের ধর্মে আবদ্ধ থাকাই হলো হেদায়েতের একমাত্র পথ। অথচ তারা সত্যের মূল রূপ পরিবর্তন করে ফেলেছিল।
এর বিপরীতে কোরআন স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে সত্য ও হেদায়েতের আসল মাপকাঠি হলো নবী ইব্রাহিমের খাঁটি তাওহিদি আদর্শ। যে ব্যক্তি এই সরল-সোজা পথে থাকবে, সে-ই হেদায়েতপ্রাপ্ত; আর যে নিজের অহংকার ও অন্ধ ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকবে, সে ভ্রষ্টতার সাগরে ভাসবে। (মুহাম্মদ আবু জাহরা, জাহরাতুত তাফাসির, ১/৪২১, দারুল ফিকর আল-আরাবি, কায়রো, ২০০৮)