আল্লাহ–তাআলা সামর্থ্যবান মানুষের ওপর হজ ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার ওপর অবশ্যকর্তব্য।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
হজ কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি একটি কষ্টসাধ্য সাধনা। এতে নিজ দেশ ও পরিবার ত্যাগ করতে হয়, অর্থ ব্যয় করতে হয় এবং শারীরিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। তাই সামর্থ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই ফরজ ইবাদতটি আদায়ের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
হজ কি পরে করলেও চলবে
একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর হজ কি তৎক্ষণাৎ ফরজ হয়, নাকি তিনি পরে করলেও চলবে—এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদের মতে, হজের সামর্থ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা আদায় করা ওয়াজিব। এটিই অধিকতর সঠিক ও শক্তিশালী মত। এর সপক্ষে মহানবীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তোমরা দ্রুত হজ আদায় করো। কারণ তোমাদের কেউ জানে না তার সামনে কী বিপদ বা প্রতিবন্ধকতা হাজির হবে।
তিনি বলেছেন, “তোমরা দ্রুত হজ আদায় করো। কারণ তোমাদের কেউ জানে না তার সামনে কী বিপদ বা প্রতিবন্ধকতা হাজির হবে।” (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৮৬৭)
এই হাদিসে নবীজি (সা.) উম্মতকে হজের জন্য দ্রুত করার তাগিদ দিয়েছেন এই ভয়ে যে যেকোনো সময় রোগব্যাধি, আর্থিক সংকট, পারিবারিক ব্যস্ততা কিংবা শত্রু বা পথের কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। (ইমাম তাবারি, জামিউল বায়ান, ১৪/৫০৫, মুয়্যাসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০১)
বিলম্ব করা কেন অনুচিত
আল্লাহ–তাআলা মুমিনদের যেকোনো নেক কাজে প্রতিযোগিতা ও দ্রুততা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৮)
হজ আদায়ে অযথা বিলম্ব করা পরহেজগারদের বৈশিষ্ট্য নয়। রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণেও এই ফরজের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন, সুতরাং তোমরা হজ করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৩৭)
শরিয়তের মূলনীতি হলো—যেকোনো আদেশ তৎক্ষণাৎ পালনের দাবি রাখে, যদি না অন্য কোনো প্রমাণ থাকে যা দেরি করার সুযোগ দেয়।
নবীজি কেন দেরি করেছেন
কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হজ যদি নবম হিজরিতে ফরজ হয়ে থাকে, তবে নবীজি (সা.) কেন দশম হিজরিতে হজ করলেন? এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত দুইটি কারণ ছিল:
১. ‘প্রতিনিধি দল’ আগমন: সেই বছর মদিনায় দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রতিনিধি দল আসত। তাঁদেরকে ইসলামের শিক্ষা দেওয়া নবীজির ওপর আবশ্যক ছিল।
কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হজ যদি নবম হিজরিতে ফরজ হয়ে থাকে, তবে নবীজি (সা.) কেন দশম হিজরিতে হজ করলেন? এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত দুইটি কারণ ছিল:
২. মক্কার পবিত্রতা রক্ষা: নবম হিজরি পর্যন্ত আরবের কিছু মুশরিক পুরাতন প্রথা অনুযায়ী নগ্ন হয়ে কাবা শরিফ তওয়াফ করত। নবীজি চেয়েছিলেন কাবা শরিফকে আগে এই অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করতে।
তাই তিনি আবু বকর (রা.)-কে আমিরে হজ বানিয়ে পাঠালেন এবং ঘোষণা দিলেন, “এই বছরের পর আর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না এবং কেউ নগ্ন হয়ে তওয়াফ করতে পারবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৯)
শাইখ ইবনে উসাইমিন এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, মক্কা বিজয়ের পর ইসলামি ব্যবস্থার পূর্ণ স্থিতিশীলতা আসার পরই হজ ফরজ হওয়া ছিল প্রজ্ঞার দাবি। (আশ-শারহুল মুমতি, ৭/১৭-১৮, দারু ইবনিল জাওজি, রিয়াদ: ২০০৪)
সারকথা
যাঁদের আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে, তাঁদের জন্য হজ আদায়ে গড়িমসি করা গুনাহের কারণ হতে পারে। বার্ধক্য কিংবা অসুস্থতা আসার আগেই আল্লাহর এই ডাক গ্রহণ করা উচিত।
যারা হজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ করে না, তাদের কড়া হুঁশিয়ারি দিতেন আবু বকর ও ওমর (রা.)। (ইমাম কুরতুবি, তাফসিরে কুরতুবি, ৪/১৫৫, মুয়্যাসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০৬)