নবুয়তের পবিত্র ছায়াতলে এমন এক অমর প্রেমের আখ্যান পাওয়া যায়, যা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে আবেগ, অধিকার ও মানবিক মর্যাদার এক ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা। এটি সাহাবি মুগিস ও বারিরার (রা.) গল্প।
এই কাহিনি কেবল বিরহের নয়, বরং এটি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মহানুভবতা এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও অধিকারের প্রতি তাঁর অগাধ সম্মানের এক অনন্য দলিল।
দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তির স্বপ্ন
এ কাহিনির প্রধান চরিত্র হজরত বারিরা (রা.)। তিনি ছিলেন একজন দাসী। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত রূপবতী ও তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ৯/৪০৭, দারুল মারিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)
কোনো দাসী যখন স্বাধীন হয়ে যান এবং তাঁর স্বামী তখনো দাসের শৃঙ্খলে থাকেন, তখন সেই নারীর অধিকার তৈরি হয় তাঁর বিবাহ টিকিয়ে রাখার অথবা বিচ্ছেদ ঘটানোর।
বারিরা তাঁর মালিকের কাছ থেকে মুক্তি লাভের জন্য ‘মুকাতাবা’ বা নির্দিষ্ট কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের চুক্তি করেন। তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম এমন নারী, যিনি নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন।
নিজের মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে তিনি আয়েশা (রা.)-এর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। হজরত আয়েশা তাঁর মর্যাদা বুঝতে পেরে নগদে তাঁর পুরো দেনা পরিশোধ করে মুক্ত করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৬০)
অন্যদিকে মুগিস (রা.) ছিলেন বারিরার স্বামী। তিনি ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাস। তাঁদের বৈবাহিক জীবনে সন্তানও ছিল। কিন্তু এ দীর্ঘ দাম্পত্য ও সন্তানাদি বারিরার হৃদয়ে মুগিসের প্রতি কোনো আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, কোনো দাসী যখন স্বাধীন হয়ে যান এবং তাঁর স্বামী তখনো দাসের শৃঙ্খলে থাকেন, তখন সেই নারীর অধিকার তৈরি হয় তাঁর বিবাহ টিকিয়ে রাখার অথবা বিচ্ছেদ ঘটানোর। একে ইসলামি পরিভাষায় ‘খিয়ারুল ইতক’ বা ‘মুক্তির কারণে প্রাপ্ত অধিকার’ বলা হয়।
একপক্ষীয় প্রেম ও বিচ্ছেদের সুর
স্বাধীনতা লাভের পর বারিরা (রা.) দেরি না করে নিজের সেই আইনি অধিকার প্রয়োগ করেন। তিনি মুগিসের সঙ্গে সংসার না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তালাক গ্রহণ করেন। এখানেই গল্পের শুরু, যেখানে এক হৃদয়ে রয়েছে সমুদ্রসমান প্রেম, আর অন্য হৃদয়ে তুষার শীতল বিমুখতা।
মুগিস বারিরাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে বিচ্ছেদের পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
মদিনার অলিগলি সাক্ষী হয়ে রইল এক বিরহী প্রেমিকের কান্নার। মুগিস বারিরার পিছু পিছু কাঁদতেন এবং তাঁর চোখের পানি গড়িয়ে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। তিনি বারিরাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বারিরার সিদ্ধান্ত ছিল অটল।
ইবনে আব্বাস (রা.) সেই করুণ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল একদিন আমার পিতা আব্বাসকে বললেন, “হে আব্বাস, আপনি কি অবাক হন না মুগিসের বারিরার প্রতি ভালোবাসা আর বারিরার মুগিসের প্রতি অনীহা দেখে?”’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮৩)
রাসুল চাইলে আদেশ দিতে পারতেন, আর তাঁর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কোনো মুমিনের ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন, জবরদস্তি করে প্রেম আদায় করা যায় না।
রাসুলের মধ্যস্থতা ও নারীর অধিকার
মুগিসের এ করুণ অবস্থা দেখে দয়ার নবীর হৃদয় ব্যথিত হয়ে ওঠে। তিনি কেবল একজন নবী বা রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন উম্মতের দরদি অভিভাবক। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট আবেগও তাঁর দৃষ্টি এড়াত না। তিনি একদিন বারিরাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি যদি ওর কাছে ফিরে যেতে (তবে ভালো হতো)।’
এখানেই ফুটে ওঠে ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর ও মানবিক দিকটি। বারিরা তাঁর অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি আমাকে আদেশ করছেন?’ নবীজি উত্তর দিলেন, ‘না, আমি কেবল সুপারিশ করছি মাত্র।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮৩)
রাসুল চাইলে আদেশ দিতে পারতেন, আর তাঁর আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কোনো মুমিনের ছিল না। কিন্তু তিনি জানতেন, জবরদস্তি করে প্রেম আদায় করা যায় না এবং মানুষের অন্তরের ওপর হুকুম চালানোর অধিকার কেবল আল্লাহর। তিনি বারিরার ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ইচ্ছার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।
বারিরা (রা.) অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তাঁর উত্তর জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘না, তাঁর প্রতি আমার কোনো প্রয়োজন বা আকর্ষণ নেই।’
এ স্পষ্ট জবাবের পর রাসুল তাঁকে আর কোনো জোরাজুরি করেননি। (সুনানে তিরমিজি, ৩/৪৬০, মুস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, মিসর, ১৯৭৫)
দাম্পত্য ও ভালোবাসার দর্শন
মুগিস ও বারিরার এই কাহিনি আমাদের পারিবারিক জীবনের এক গভীর দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা দাম্পত্য জীবনকে ‘মিত্রাকান গালিজা’ বা এক সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (সুরা নিসা, আয়াত: ২১)
অথচ অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার ঘাটতি তৈরি হয়। ইসলাম শিখিয়েছে যে যদি ভালোবাসা না–ও থাকে, তবু যেন উভয়ে একে অপরের অধিকার ও পাওনা সুচারুভাবে আদায় করে।
তবে যেখানে ঘৃণা বা অনীহা এত চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেখানে বিচ্ছেদের পথকেও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বারিরার বিমুখতা কেন ছিল? কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, মুগিসের প্রতি তাঁর সহজাত কোনো ঘৃণা ছিল না, বরং তিনি হয়তো চেয়েছিলেন তাঁর নতুন জীবনের স্বাধীনতাকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতে অথবা তাঁদের স্বভাবগত অমিলই ছিল এর কারণ। (মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ ফি যাওইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, ২/৫২০, দারুল কলম, দামেস্ক, ১৯৯৯)
মুগিসের ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে আল্লাহর রাসুলের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে নিজের আবেগ প্রকাশ করা কোনো হীনম্মন্যতা নয়।
বর্তমান সমাজে আমরা দেখি, অনেকের মধ্যে তিক্ততা তৈরি হলেও সমাজ বা পরিবারের চাপে তাঁরা ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটান। বারিরার সাহসী সিদ্ধান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের অন্তরকে বাধ্য করার অধিকার কারও নেই।
প্রেমের শুদ্ধতা ও মানবিক মর্যাদা
মুগিসের ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করে আল্লাহর রাসুলের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে নিজের আবেগ প্রকাশ করা কোনো হীনম্মন্যতা নয়।
অন্যদিকে বারিরার স্পষ্টবাদিতা প্রমাণ করে যে নারী হিসেবে তাঁর নিজের ভালো লাগা বা মন্দ লাগাকে গুরুত্ব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার ইসলাম তাঁকে দিয়েছে। বারিরাও কপট প্রেমের অভিনয় করতে চাননি।
কখনো কখনো বিচ্ছেদই হয় কল্যাণের পথ। মুগিস ও বারিরার গল্প আমাদের শেখায় যে বিচ্ছেদ মানেই একে অপরের চরম শত্রু হয়ে যাওয়া নয়। যদিও মুগিস কাঁদছিলেন, তবু তিনি বারিরার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেননি।
আর বারিরাও অত্যন্ত আদবের সঙ্গে রাসুলের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
ইসলামি শরিয়তে তালাক বা বিচ্ছেদকে সবচেয়ে অপ্রিয় বৈধ কাজ বলা হলেও যেখানে মায়া ও করুণার অনুপস্থিতি ঘটে, সেখানে একেই মুক্তির পথ হিসেবে দেখা হয়।