জনসচেতনতা নির্মাণে মসজিদের ভূমিকা: হারানো ঐতিহ্য ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
মদিনার পবিত্র ভূমিতে যেদিন প্রথম আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, সেদিন থেকেই মসজিদ কেবল মুসলিমদের ইবাদত বা উপাসনার জন্য নির্ধারিত কোনো চারদেয়াল ছিল না। বরং মসজিদ ছিল একটি জাতির পরিচয় গড়ার সূতিকাগার এবং জনসচেতনতা নির্মাণের প্রাণকেন্দ্র।
মসজিদের মিম্বর ছিল সত্যের কণ্ঠস্বর, কোরআনের দরস ছিল জ্ঞানের আলো এবং মসজিদের আঙিনা ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় বড় সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে এবং সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনের ঢেউয়ে আজ প্রশ্ন উঠেছে—মসজিদ কি আজও জনসচেতনতা তৈরিতে তার সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারছে? নাকি এটি এখন কেবলই একটি আনুষ্ঠানিক উপাসনালয়ে পরিণত হয়েছে?
ইতিহাসের আয়নায় মসজিদের বহুমুখী ভূমিকা
নবীজি (সা.)-এর পবিত্র সিরাত বা জীবনচরিত অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, মসজিদে নববী কেবল নামাজের জন্য একটি মিহরাব ছিল না। এটি ছিল একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠান। এর ভূমিকা ছিল বহুমুখী:
১. জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ: মসজিদে নববী ছিল একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম কোরআন, ফিকহ এবং উন্নত জীবনদর্শন শিখতেন। সুরা তওবায় আল্লাহ তাআলা তাদের প্রশংসা করেছেন যারা আল্লাহর মসজিদকে আবাদ করে এবং সেখানে হিদায়াতের আলো ছড়ায় (সুরা তাওবা, আয়াত: ১৮)। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/১২৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)।
২. প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র: ইসলামি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণ এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক—সবই সম্পন্ন হতো মসজিদের আঙিনায়। এটি ছিল রাষ্ট্রের সচিবালয় স্বরূপ। (সাফিউর রহমান মোবারকপুরি, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৭০, আল-কোরআন পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০৭)।
৩. সামাজিক নিরাপত্তা ও সেবা কেন্দ্র: মসজিদের এক কোণে ‘আহলুস সুফফাহ’ নামে যে স্থানটি ছিল, তা ছিল নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন মানুষদের আশ্রয়স্থল। অর্থাৎ মসজিদ ছিল তৎকালীন সমাজের সবচেয়ে বড় সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪২)
বর্তমান প্রেক্ষাপট: মসজিদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জসমূহ
আধুনিক যুগের দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রায় মসজিদ তার সেই কেন্দ্রীয় আবেদন অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান সময়ে মসজিদের সামনে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে:
তরুণ প্রজন্মের বিমুখতা: আজ অধিকাংশ তরুণ তাদের জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে মসজিদের মিম্বরের চেয়ে ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে বেশি পছন্দ করছে। মসজিদের গতানুগতিক কার্যক্রম অনেক সময় তরুণদের আধুনিক চিন্তাধারার সাথে মেলবন্ধন তৈরি করতে পারছে না।
ইউসুফ আল-কারজাভি উল্লেখ করেছেন যে, যুবসমাজকে ইসলামের দিকে টানতে হলে তাদের ভাষা ও সংকট বুঝতে হবে। (আল-ইবাদাহ ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৯৫, মাকতাবাহ ওয়াহবা, কায়রো, ১৯৯৫)।
খুতবা ও আলোচনার সীমাবদ্ধতা: অনেক ক্ষেত্রে মসজিদের খুতবা বা বয়ান কেবল কতিপয় আনুষ্ঠানিক বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সমকালীন বিশ্বের জটিল সমস্যা, অর্থনীতি, রাজনীতি বা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো মসজিদের আলোচনায় উঠে না আসায় সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে মিম্বরের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। (আব্দুল কারিম যায়দান, উসুলুদ দাওয়াহ, পৃষ্ঠা ৪১০, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০২)।
ডিজিটাল ও মিডিয়ার প্রভাব: বর্তমানে জনসচেতনতা বা ‘অ্যাওয়ারনেস’ তৈরির প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে স্ক্রিন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। মসজিদের মিম্বর যদি এই ডিজিটাল বিপ্লবের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারে, তবে এর প্রভাব ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়বে।
হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথ
মসজিদকে আবারও জনসচেতনতা ও আদর্শ মানুষ গড়ার কারখানায় পরিণত করতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. ধর্মীয় বার্তার আধুনিকায়ন: মসজিদের খুতবা ও আলোচনা কেবল পরকালীন ভয়ভীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনমুখী করতে হবে। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, অর্থনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো খুতবায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। (মুহাম্মদ সাঈদ রমজান আল-বুতি, ফিকহুস সিরাহ, পৃষ্ঠা ১৫৪, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২০০৬)
২. সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়ানো: মসজিদকে কেবল নামাজের সময়ের জন্য উন্মুক্ত না রেখে একে একটি সামাজিক কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। মসজিদের তত্ত্বাবধানে যদি অবৈতনিক শিক্ষা কেন্দ্র, পারিবারিক পরামর্শ কেন্দ্র (Counseling Center) কিংবা লাইব্রেরি গড়ে তোলা যায়, তবে মানুষের সাথে মসজিদের আত্মিক সম্পর্ক আরও গাঢ় হবে।
৩. তরুণদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ: মসজিদে তরুণদের জন্য আলাদা কর্মসূচি রাখা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করলে তারা মসজিদকে তাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করতে শুরু করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সবসময় যুবকদের ওপর আস্থা রাখতেন এবং তাঁদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতেন। (ইবনুল কাইয়িম জাওজি, জাদুল মাআদ, ৩/৫০, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৪)
৪. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার: প্রতিটি বড় মসজিদের নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল থাকা উচিত, যার মাধ্যমে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো কেবল মুসল্লিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫. ইমাম ও খতিবদের বিশেষ প্রশিক্ষণ: ইমামগণ কেবল নামাজ পড়ানোর কারিগর নন, বরং তারা হবেন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা। বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য তাঁদেরকে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সমকালীন সমস্যা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। (ইউসুফ আল-কারজাভি, ফিকহুল উসরাহ, ১/১৩৫, আল-রিসালা পাবলিশার্স, বৈরুত, ২০০১)।
সচেতনতা নির্মাণে মিম্বরের প্রভাব
মসজিদের মিম্বর থেকে যখন ন্যায়বিচার, সততা এবং জনকল্যাণের কথা বলা হয়, তখন তার প্রভাব সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছায়। কোনো আইন বা জরিমানা দিয়ে মানুষকে যতটা সুশৃঙ্খল করা যায়, মসজিদের আধ্যাত্মিক পরশ তার চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
ইসলামে সমাজসংস্কারের প্রথম পদক্ষেপই হলো মানুষের চিন্তার পরিবর্তন করা। আর মসজিদই হলো সেই জায়গা যেখানে মানুষের অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় জাগ্রত করার মাধ্যমে তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
সম্মিলিত দায়িত্ব
মসজিদ একটি জাতির আত্মা স্বরূপ। মসজিদের কণ্ঠ যখন স্তব্ধ হয়ে যায় বা এর আবেদন যখন কমে যায়, তখন সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা দেখা দেয়। মসজিদের ভূমিকা পুনরায় সক্রিয় করা কেবল ইমাম বা কমিটির দায়িত্ব নয়, বরং এটি সমগ্র মুসলিম সমাজের সম্মিলিত কর্তব্য।
আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, মসজিদ কেবল একটি স্থাপত্যশৈলী নয়, বরং এটি জীবন গড়ার পাঠশালা। যদি আমরা মসজিদকে আবার হেদায়েত ও সচেতনতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তবে সমাজ থেকে অন্ধকার দূর হবে এবং একটি শান্তিময় সমাজ গঠিত হবে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১০)
মসজিদ যখন তার পূর্ণ শক্তিতে ফিরবে, তখন তা কেবল মুসল্লিদের কেন্দ্র থাকবে না, বরং তা হবে গোটা মানবজাতির জন্য কল্যাণ ও দিকনির্দেশনার এক উজ্জ্বল বাতিঘর।