মানুষের জীবন এক অন্তহীন যাত্রা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই সংক্ষিপ্ত পথটুকু পাড়ি দিতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই আমাদের গন্তব্যের কথা। এই পৃথিবী কি আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা, নাকি আমরা এখানে কেবলই কিছু সময়ের অতিথি?
এই চিরন্তন প্রশ্নের এক চমৎকার সমাধান দিয়েছেন মানবতার মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর একটি অমর বাণী আমাদের শেখায় কীভাবে এই নশ্বর পৃথিবীতে থেকেও পরকালের অবিনশ্বর শান্তির পথে এগিয়ে চলা যায়।
পথচারী ও আগন্তুকের জীবনদর্শন
বিখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর রাসুল আমার কাঁধ ধরে বললেন, “দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত আগন্তুক অথবা একজন পথচারী বা মুসাফির।”’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪১৬)
এই হাদিস মুমিনের জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি। একজন আগন্তুক যখন কোনো নতুন শহরে যায়, তখন সে জানে যে সেখানে সে স্থায়ী নয়। তার মন সব সময় পড়ে থাকে নিজের ফেলে আসা ঠিকানায়। একইভাবে একজন পথচারীর মূল মনোযোগ থাকে তার গন্তব্যের দিকে। পথের ধারের দৃশ্য তাকে মুগ্ধ করতে পারে, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিতে পারে না।
দুনিয়া একটি সেতুমাত্র। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেতুর ওপর ঘর বাঁধে না, বরং দ্রুত সেটি পার হওয়ার চেষ্টা করে।ইবনে আতাউল্লাহ ইসকান্দারি (রহ.), বিখ্যাত সুফি সাধক ও পণ্ডিত
জীবনকে যদি একটি বিমানযাত্রার সঙ্গে তুলনা করি, তবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বিমানে কেউ হয়তো প্রথম শ্রেণিতে আয়েশ করে বসে আছেন, আবার কেউ পেছনের দিকের সাধারণ আসনে কিছুটা গাদাগাদি করে বসে আছেন।
কিন্তু বুদ্ধিমান যাত্রী কখনোই সিট নিয়ে মারামারি করেন না বা পাশের জনের সম্পদ দেখে হিংসা করেন না। কারণ, তিনি জানেন, কয়েক ঘণ্টার এই অস্বস্তি শেষ হওয়ার পরই তিনি এক চমৎকার গন্তব্যে পৌঁছাবেন, যেখানে সবার পরিচয় হবে তাদের কর্ম দিয়ে, বিমানের আসন দিয়ে নয়। যারা দুনিয়াকে একমাত্র গন্তব্য মনে করে, তারা যেন বিমানের সিট আর খাবারের প্যাকেট নিয়ে ঝগড়া করতেই পুরো সফরটি পার করে দেয়।
দুনিয়া উদ্দেশ্য নয়, কেবল মাধ্যম
ইসলাম আমাদের দুনিয়া ত্যাগ করতে বলেনি, বরং দুনিয়াকে সঠিক জায়গায় রাখতে শিখিয়েছে। আমাদের হৃদয় হবে পরকালের জন্য, আর হাত হবে দুনিয়ার কাজের জন্য। এই পৃথিবী আমাদের গভীরতম আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করার জন্য তৈরি করা হয়নি। আমাদের অতৃপ্তিই প্রমাণ করে যে আমাদের আসল ঠিকানা অন্য কোথাও।
বিখ্যাত সুফি সাধক ও পণ্ডিত ইবনে আতাউল্লাহ ইসকান্দারি (রহ.)-এর মতে, দুনিয়া একটি সেতুমাত্র। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেতুর ওপর ঘর বাঁধে না, বরং দ্রুত সেটি পার হওয়ার চেষ্টা করে। (ইবনে আতাউল্লাহ ইসকান্দারি, আল-হিকাম)
আপনার হাতে অনেক সম্পদ থাকতে পারে, আপনি অনেক প্রভাবশালী হতে পারেন, অথবা আপনি অতিসাধারণ একজন মানুষ হতে পারেন—মুসাফির হিসেবে এতে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, এই সম্পদ বা অভাব কেবল সফরের উপকরণমাত্র।
তোমরা জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতামাত্র...কোরআন, সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০
এই যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ
দুনিয়া অস্থায়ী হওয়ার অর্থ এই নয় যে এর কোনো গুরুত্ব নেই। বরং এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, এই সংক্ষিপ্ত সফরে আমরা আমাদের সীমিত সম্পদ ও সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছি, তার ওপরই নির্ভর করবে আমাদের পরকালীন জীবনের মান।
বিলাসিতা বনাম উপযোগিতা: ইসলাম শেখায় যে জিনিসগুলো আমরা ব্যবহার করছি, তা যেন আমাদের ‘মালিক’ হতে না পারে। সম্পদ যেন আমাদের প্রদর্শনের বস্তু না হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির হাতিয়ার হয়।
অপ্রাপ্তির বেদনা থেকে মুক্তি: যখন কেউ নিজেকে মুসাফির মনে করে, তখন জাগতিক অপ্রাপ্তি তাকে খুব বেশি বিচলিত করতে পারে না। সে জানে, এই অভাবটুকু কেবল কয়েক দিনের সফরের সঙ্গী।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্য লাভের প্রতিযোগিতামাত্র...’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)
‘আগন্তুক’ হওয়ার সুফল
দুনিয়ার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত মোহ মানুষের মনের শান্তি কেড়ে নেয়। যখন আমরা এই মাটির পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে শিকড় গাড়তে চাই, তখন বস্তুবাদী চাহিদার কোনো শেষ থাকে না। একটি পাওয়ার পর আরেকটি পাওয়ার তৃষ্ণা আমাদের অন্ধ করে দেয়। আমরা আমাদের কাছে যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ হতে ভুলে যাই।
কিন্তু ‘আগন্তুক’ বা ‘মুসাফির’ হয়ে বাঁচার মধ্যে রয়েছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি:
১. উদ্বেগহীন জীবন: যখন গন্তব্য আল্লাহর দিকে স্থির থাকে, তখন দুনিয়ার ছোটখাটো হারানো বা পাওয়ার ঘটনাগুলো আর দুশ্চিন্তার কারণ হয় না।
২. ক্ষমাশীলতা: মুসাফির অন্যকে সহজে ক্ষমা করে দিতে পারে। কারণ, সে জানে, এই যাত্রাপথে বিবাদ করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই।
যখনই মন অস্থির হবে, তখনই নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত, ‘আমি তো এখানে স্থায়ী নই, আমি তো
৩. মানবিক গুণাবলির বিকাশ: একজন মুসাফির নম্রতা, সহানুভূতি ও কৃতজ্ঞতার মতো গুণগুলো লালন করতে পারেন। কারণ, তিনি অন্য মানুষের মধ্যেও সেই একই ব্যাকুল মুসাফির সত্তাকে দেখতে পান।
আল্লাহর কাছে এই পুরো দুনিয়ার মূল্য একটি মশার ডানার সমানও নয়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২,৩২০)
অথচ এই নগণ্য দুনিয়ার পেছনেই আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ সময় ও শক্তি ব্যয় করি। আমরা কি পারি না এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেলতে?
আমাদের আসল পরিচয় আমরা জান্নাতের অধিবাসী, যারা সাময়িকভাবে এই পৃথিবীতে প্রবাসজীবন কাটাচ্ছি। এই প্রবাস জীবনে আমাদের কাজ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং নিজের গন্তব্যস্থলকে সুন্দর করার জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা।
যখনই মন অস্থির হবে, তখনই নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত, ‘আমি তো এখানে স্থায়ী নই, আমি তো কেবলই একজন মুসাফির।’