স্বপ্নে বা জাগরণে নবীজি (সা.)-কে দেখা: ইসলাম কী বলে

ছবি: এএফপি

মুমিনের হৃদয়ে মহানবী (সা.)–এর প্রতি ভালোবাসা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই গভীর ভালোবাসার টানে অনেক মুমিনই স্বপ্নে নবীজির দর্শন লাভ করেন। তবে আধ্যাত্মিক জগতের আলোচনায় একটি বিতর্ক দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে—তা হলো জাগ্রত অবস্থায় নবীজিকে দেখা সম্ভব কি না?

কেউ কেউ দাবি করেন যে তাঁরা সশরীরে নবীজিকে দেখেছেন বা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়ত, কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতি এবং সাহাবিদের আমলের আলোকে এই দাবির সত্যতা কতটুকু, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

জাগ্রত অবস্থায় দেখা কি সম্ভব

শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে জাগ্রত অবস্থায় নবীজিকে সশরীরে দেখা সম্ভব নয়। কারণ নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করে ‘রফিকে আলা’ বা মহান বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। তিনি এখন ‘আলমে বারজাখ’ বা কবরের জগতে অবস্থান করছেন। যারা বর্তমানে জীবিত আছেন, তাঁরা হলেন ‘আলমে শাহাদাত’ বা দৃশ্যমান জগতের অধিবাসী। 

দৃশ্যমান জগতের কোনো মানুষের পক্ষে সাধারণ অবস্থায় অদৃশ্য বা বারজাখি জগতের কাউকে সশরীরে দেখা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

যদি কেউ দাবি করেন যে তিনি স্বপ্নে নয় বরং বাস্তবে নবীজিকে দেখেছেন, তবে তা হবে মূলত তাঁর কল্পনাপ্রসূত বিভ্রম বা শয়তানি ধোঁকা। চাই সেই ব্যক্তি আপাত দৃষ্টিতে অনেক বড় বুজুর্গ হন না কেন। তাঁর এই দাবি শরিয়তের কোনো দলিল দ্বারা প্রমাণিত নয়।

সুফিবাদে এই ধরনের কিছু ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেলেও ইসলামি গবেষকগণ সেগুলোকে ‘মাওয়াজিদ’ বা বিশেষ আবেগময় মুহূর্তের ঘোরে দেখা অবাস্তব চিত্র হিসেবে গণ্য করেছেন। সেই অবস্থায় ব্যক্তির হুঁশ ও বোধশক্তি লোপ পায় বিধায় তাদের কথা থেকে কোনো শরয়ি জ্ঞান বা বিধিবিধান আহরণ করা যায় না। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১/২৮৫, দারুল ওয়াফা, বৈরুত, ২০০৫)

স্বপ্নে নবীজিকে দেখার হুকুম

স্বপ্নে নবীজিকে দেখা একটি মহাসৌভাগ্য এবং এটি সত্য। আবু হোরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে আমাকেই দেখল। কেননা শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬৬)

তবে এই দেখার ক্ষেত্রে আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তারোপ করেছেন। তা হলো, তাঁকে সেই প্রকৃত শারীরিক অবয়বে দেখতে হবে যা হাদিস ও সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

যদি কেউ তাঁকে এমন কোনো আকৃতিতে দেখে যা তাঁর শান বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের (যেমন: কুঁজো হওয়া, দাড়ি না থাকা দেখা ইত্যাদি) পরিপন্থী, তবে সে ক্ষেত্রে আলেমদের দুটি মত রয়েছে:

১. এটি সেই ব্যক্তির ধার্মিকতার অভাব বা ত্রুটি নির্দেশ করে।

২. ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, তাহলে তিনি নবীজি নন বরং শয়তান অন্য কোনো রূপ ধারণ করে মিথ্যা দাবি করেছে যে সে আল্লাহর রাসুল। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১/২৮৫, দারুল ওয়াফা, বৈরুত, ২০০৫)

আরও পড়ুন

সাহাবিদের অনুসৃত পথ

জাগ্রত অবস্থায় দেখার দাবি যদি সত্য হতো, তবে ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব সাহাবিরা এর সবচেয়ে বড় হকদার ছিলেন। হজরত আবু বকর, ওমর, উসমান, আলী (রা.)-সহ জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিগণ এবং আহলে বাইতের সদস্যগণ অনেক কঠিন সংকটে পতিত হয়েছিলেন।

অনেক যুদ্ধে তাঁরা বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন। তাঁরা কখনও এমন দাবি করেননি যে নবীজি (সা.) সশরীরে এসে তাঁদের সঙ্গে মুসাফাহা করেছেন বা সমাধান দিয়েছেন।

সাহাবিরা হলেন শ্রেষ্ঠ ‘আউলিয়া’। তাঁদের চেয়ে বড় কোনো ওলি পরবর্তীতে পৃথিবীতে আসেননি। নবীজির ইন্তেকালের পরে যখন তাঁরা তাঁকে জাগ্রত অবস্থায় পাননি, তখন পরবর্তীতে কোনো সুফি বা ব্যক্তির এই দাবি করা বাস্তবতাবিবর্জিত।

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, “স্বপ্নে নবীজিকে দেখা সত্য এবং তা একটি সুসংবাদ। কিন্তু কোরআন-সুন্নাহর অকাট্য বিধানের বিপরীতে স্বপ্নের কোনো বিষয় গ্রহণ করা যাবে না।” (শারহুন নাবাবি আলা সহিহি মুসলিম, ১/১১৫, দারু ইহয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৩৯২ হিজরি)

উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি স্বপ্নে দেখে নবীজি তাকে বলছেন যে আগামীকাল রমজান শুরু হবে (অথচ চাঁদ দেখা যায়নি), তবে তার সেই দেখা অনুযায়ী রোজা রাখা জায়েজ হবে না। একইভাবে স্বপ্নে কেউ কাউকে চোর বললে বা কোনো আইনি ফয়সালা দিলে তা আদালতের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ নবীজির মৃত্যুর পর ওহির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।

জাগ্রত অবস্থায় নবীজি (সা.)-কে দেখার সুযোগ কেবল কেয়ামতের দিন হাউজে কাউসারে এবং জান্নাতে হবে—এই বিশ্বাসই আকিদাগতভাবে বিশুদ্ধ।

আরও পড়ুন