বিপদে মুমিনের প্রথম করণীয় কী

ছবি: পেক্সেলস

মানুষের জীবন সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক দীর্ঘ পথচলা। এই পথচলায় এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন কষ্টে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কিছু দুঃখ আছে যা সবাইকে বলা যায় না; আবার কিছু ব্যথা এমন, যা ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন।

এমন সময় মানুষ এমন একজনকে খোঁজে, যার কাছে নির্ভয়ে মনের সব কথা বলা যায়। ইসলাম শেখায়, সেই আশ্রয় প্রথমে মানুষের কাছে নয়; আল্লাহর কাছে খুঁজতে হবে।

আল্লাহর কাছে দুঃখ নিবেদন

পবিত্র কোরআনে ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনে আমরা এর অনন্য উদাহরণ দেখি। প্রিয় সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার গভীর বেদনায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার দুঃখ ও বেদনার কথা শুধু আল্লাহর কাছেই পেশ করছি।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৬)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, বিপদ ও সংকটের সময় একজন মুমিনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ, মানুষের সহানুভূতি সীমিত হলেও আল্লাহর রহমত সীমাহীন।

ইসলাম অভিযোগের পরিবর্তে প্রার্থনার শিক্ষা দেয়। আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি ইমানের পরিচয়।
আরও পড়ুন

অভিযোগ নয়, প্রার্থনা

দুঃখের সময় অনেক মানুষ অভিযোগে ডুবে যায়। কেউ ভাগ্যকে দোষারোপ করে, কেউ পরিস্থিতিকে, আবার কেউ মানুষকে। কিন্তু অভিযোগ হৃদয়ের ভার কমায় না; বরং হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ইসলাম অভিযোগের পরিবর্তে প্রার্থনার শিক্ষা দেয়। আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করা কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি ইমানের পরিচয়। হজরত আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন কঠিন রোগ ও পরীক্ষার মধ্যে থেকেও ধৈর্য হারাননি।

তিনি বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বাধিক দয়ালু।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)

এই সংক্ষিপ্ত দোয়ার মধ্যেই ছিল পূর্ণ আত্মসমর্পণ, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাঁকে মুক্তি ও সম্মান দান করেছিলেন।

নির্জনে আল্লাহর স্মরণ

প্রতিটি মুমিনের জীবনে এমন কিছু সময় থাকা উচিত, যখন সে পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে শুধু তার রবের সঙ্গে কথা বলবে। রাতের নীরবতা, তাহাজ্জুদের সময়, ফরজ নামাজের পর কিংবা সিজদার মুহূর্ত—এসব সময় দোয়ার জন্য বিশেষ উপযোগী।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদা অবস্থায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮২)

সিজদা হলো এমন এক স্থান, যেখানে হৃদয়ের গভীরতম ব্যথাও নিরাপদে আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়।

আরও পড়ুন

আল্লাহ সবই জানেন

মানুষের জীবনে এমন সময় আসে, যখন সে মনে করে তার কষ্ট কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু প্রকৃত মুমিন জানেন, মহান আল্লাহ তার অন্তরের প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুর খবর রাখেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের গোপন কথাও জানেন।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৩)

আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।
কোরআন, সুরা তালাক, আয়াত: ৩

এই বিশ্বাস মানুষের মনে আশা জাগায়; তাকে শক্তি দেয় এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।

তিনিই একমাত্র আশ্রয়

মানুষের স্বভাব হলো, কষ্টে পড়লে মানুষের কাছে সান্ত্বনা খোঁজা। কিন্তু একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার রবের ওপর আস্থা ও ভরসা। কোরআনে কারিমে এসেছে, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)

যখন হৃদয় ভারী হয়ে যায়, তখন মানুষের দরজায় নয়; আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়া উচিত। কারণ মানুষ হয়তো আপনার কথা শুনবে, কিন্তু সব সমস্যার সমাধান তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর দয়াময় প্রভু শুধু শোনেনই না; বরং তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় উত্তম ফয়সালাও নির্ধারণ করেন।

শেষ কথা

মানুষের জীবন নানা পরীক্ষায় পূর্ণ। তবে এই পরীক্ষার মাঝেই লুকিয়ে থাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অপার সুযোগ। তাই দুঃখ-কষ্টে অভিযোগ নয়; বরং ধৈর্য, দোয়া ও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণই হওয়া উচিত একজন মুমিনের প্রকৃত আশ্রয়।

  • রায়হান আল ইমরান : লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন