মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিরহস্য, নেয়ামত ও কুদরতের নিদর্শন বোঝাতে কোরআনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান, প্রাণী এবং উদ্ভিদের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি ফলের কথা কোরআনে এসেছে, যেগুলো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর যেমন; তেমন বরকতময়।
বেহেশতের অধিবাসীদেরও এই সকল ফল–ফলাদি পরিবেশন করা হবে বলে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে। প্রধান ৬টি ফলের আলোচনা করা হলো।
১. খেজুর: বেহেশতের উৎকৃষ্ট ফল
কোরআনে সবচেয়ে বেশিবার যে ফলের নাম এসেছে, সেটি হলো খেজুর বা ‘নাখল’। মরুভূমির তপ্ত পরিবেশে খেজুর কেবল একটি সুস্বাদু ফলই নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আহার।
কোরআনের অন্তত ২০টি স্থানে খেজুরের কথা বলা হয়েছে।
মরিয়ম (আ.) যখন সন্তান প্রসবের বেদনায় কাতর ছিলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে খেজুর খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার দিকে খেজুরগাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার ওপর সুপক্ব তাজা খেজুর ঝরে পড়বে।’ (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৫)
ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়্যা লিখেছেন, খেজুর একই সঙ্গে খাদ্য, পানীয়, মিষ্টি এবং ওষুধ হিসেবে কাজ করে, যা শরীরকে সতেজ করার পাশাপাশি প্রসূতি মায়ের শারীরিক শক্তি দ্রুত ফিরিয়ে আনে। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৪/২৬২, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)
রাসুল (সা.) মদিনার আজওয়া খেজুরের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সে দিন কোনো বিষ বা জাদু তার ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৪৫)
২. জলপাই: বরকতময় ফল
কোরআনে জয়তুনকে একটি ‘বরকতময় গাছ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহর নুরের উপমা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘এটি প্রজ্বলিত করা হয় বরকতময় জয়তুন গাছের তেল দ্বারা, যা পূর্বদিকেরও নয়, পশ্চিমদিকেরও নয়।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩৫)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জয়তুনের তেল খাও এবং তা শরীরে মাখো, কেননা এটি একটি বরকতময় গাছ থেকে উৎপন্ন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৫১)
৩. ডুমুর: যার নামে আল্লাহর শপথ
ডুমুর ফলের নামে কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা রয়েছে, যাকে আরবিতে বলে ‘তিন’ ফল। এই ফলের শপথ করেই আল্লাহ সুরা তিন শুরু করেছেন। কসম করে বলেছেন, ‘শপথ ডুমুর ও জয়তুনের।’ (সুরা তিন, আয়াত: ১)
ইমাম কুরতুবি লিখেছেন, ডুমুর অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন একটি ফল; এর কোনো অংশ ফেলে দিতে হয় না, পুরোটাই খাওয়া যায়। এটি দ্রুত হজম হয় এবং পাকস্থলীর ভেতরকার দূষিত পদার্থ পরিষ্কার করে দেয়। (আল-কুরতুবি, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ২০/১১০, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪)
৪. আনার: সুরা রহমানের ‘রুম্মান’
সুমিষ্ট ও দৃষ্টিনন্দন ফল ডালিমকে কোরআনে ‘রুম্মান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে ডালিমকে বেহেশতের ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
মহান আল্লাহ তাঁর অনন্য সৃষ্টির উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘তাতে রয়েছে ফলমূল, খেজুর ও ডালিম।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ৬৮)
এ ছাড়া সুরা আনআমে ডালিম গাছের বৃদ্ধি ও ফলের বৈচিত্র্য নিয়ে চিন্তাভাবনা করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (আয়াত: ৯৯) এটি রক্তবর্ধক ও হৃৎপিণ্ডের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি ফল।
৫. আঙুর: প্রাচীন পুষ্টিকর ফল
কোরআনে আঙুরের কথা প্রায় ১১ বার উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও পুষ্টিকর এই ফলকে বেহেশতিদের পুরস্কারের বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই খোদাভীরুদের জন্য রয়েছে সফলতা; বাগবাগিচা ও আঙুরসমূহ।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৩১-৩২)
দুনিয়ার জীবনেও এটি মানুষের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, আঙুর হলো এমন এক উৎকৃষ্ট নেয়ামত, যা মানুষ কাঁচা ও শুকনো (কিশমিশ) উভয় অবস্থায়ই উপভোগ করতে পারে এবং এতে রয়েছে প্রচুর শারীরিক শক্তি। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৬৬২, দারুত তাইবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
৬. কলা: বেহেশবাসীর আনন্দের ফল
বেহেশতের প্রশান্তিদায়ক পরিবেশের বর্ণনায় কোরআনে কলার প্রসঙ্গ এসেছে। আরবিতে এটিকে ‘তালহ’ বলা হয়েছে।
আল্লাহ বেহেশবাসীর আরাম-আয়েশের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, তারা থাকবে ‘কাঁটাবিহীন কুলগাছের নিচে এবং স্তরে স্তরে সাজানো কলাগাছের নিচে।’ (সুরা ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ২৮-২৯)
আয়াতের ‘তালহ’ শব্দটি দ্বারা অধিকাংশ আলেমের মতে কলাগাছকেই বোঝানো হয়েছে, যার ফলগুলো দৃষ্টিনন্দনভাবে স্তরে স্তরে সাজানো থাকে এবং অত্যন্ত সহজপাচ্য ও তাৎক্ষণিক শক্তিদায়ী একটি ফল। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৭/৫২৭, দারুত তাইবা, রিয়াদ, ১৯৯৯)
কোরআনে উল্লেখিত এই ফলগুলো শুধু পরকালের বেহেশতের কল্পিত কোনো বিষয় নয়; বরং দুনিয়ার জীবনেও এগুলো মানুষের সুস্থতা ও রোগ নিরাময়ের জন্য এক বিরাট নেয়ামত।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এসব ফলের উপস্থিতি আমাদের শরীরকে যেমন সুস্থ রাখে, তেমনি এসব গ্রহণ করার মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম কুদরতের প্রতি আমাদের ইমান ও কৃতজ্ঞতাবোধ আরও সুদৃঢ় হয়।