হেদায়েত আল্লাহ–তাআলার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামতগুলোর একটি। এটি এমন এক ঐশী দিকনির্দেশনা, যা মানুষকে সত্য ও সরল পথের সন্ধান দেয় এবং সেই পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
মানুষের জ্ঞান, মেধা ও প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, প্রকৃত হেদায়েত একমাত্র আল্লাহর দান। তিনি যাকে চান তাকে দান করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহ–তাআলা কাউকে অন্যায়ভাবে থেকে বঞ্চিত করেন।
বরং মানুষকে তিনি ইচ্ছাশক্তি ও বিবেক দিয়েছেন। যারা সত্যকে গ্রহণ করতে চায় না এবং আল্লাহর নির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ তাদের জোরপূর্বক সৎপথে আনেন না।
যারা আন্তরিকভাবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে, তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়তে চায়, আল্লাহ তাদের একা ছেড়ে দেন না; বরং তাদের জন্য হেদায়েতের পথ সহজ করে দেন।
তিনি বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথসমূহের দিকে পরিচালিত করব।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৯)
এই হেদায়েতের অন্যতম নিদর্শন হলো, আল্লাহ বান্দার অন্তরকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। ফলে তাঁর আদেশ পালন করা, নিষেধ থেকে বিরত থাকা, ইবাদতে মনোযোগী হওয়া ও পাপ থেকে বেঁচে থাকা বান্দার সহজ ও প্রিয় হয়ে ওঠে।
হেদায়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তির জীবনে কিছু সুস্পষ্ট আলামত প্রকাশ পায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হলো—
১. পরকালমুখী হওয়া
হেদায়েতের অধিকারী ব্যক্তির বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সে দুনিয়াকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করে না। তার বিশ্বাস, প্রকৃত ও স্থায়ী জীবন হলো পারকালের জীবন।
তাই সে দুনিয়ায় প্রয়োজন পূরণ করে ঠিক, কিন্তু তার অন্তরে আকাঙ্ক্ষা থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পারকালের সফলতা। সে দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা বা সম্মানকে জীবনের একমাত্র সফলতা মনে করে না। বরং এগুলো পারকালের পাথেয় হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
তার দোয়া, পরিশ্রম ও পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ জন্যই মুমিন ব্যক্তি প্রার্থনা করেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং পরকালেও কল্যাণ দান করুন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০১)
২. দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা
দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করার মানে জীবন-জীবিকা ত্যাগ করা নয়; বরং এসবের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হওয়া।
ইসলাম কখনো বৈধ উপার্জন, পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব ও পৃথিবীর কল্যাণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বলে না। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, দুনিয়ার সম্পদ, ভোগ-বিলাস ও মর্যাদার মোহ যেন মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করতে না পারে।
বরং দুনিয়াকে এমনভাবে গ্রহণ করা তা যেন পরকালের সফলতা অর্জনের মাধ্যম হয়।
কিন্তু যাদের সব চিন্তা ও প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু শুধু দুনিয়া, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতেই দাও।” অথচ পরকালে তার কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০০)
৩. মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা
মৃত্যু মানবজীবনের অবধারিত সত্য বিষয়। কখন, কোথায় ও কীভাবে মৃত্যু আসবে—তা কেউ জানে না। তাই একজন মুমিনের উচিত সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকা। এমনভাবে জীবন যাপন করা, যেকোনো মুহূর্তে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ডাক এলে যেন লজ্জিত হতে না হয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
হেদায়েতের প্রভাব মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত আল্লাহর কাছে সর্বদা হেদায়েত প্রার্থনা করা এবং সেই দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজের জীবন গড়ে তোলা।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী