মা যদি আর্থিক প্রতারণা করেন সন্তানের করণীয় কী

ছবি: পেক্সেলস

পৃথিবীতে সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও ভালোবাসার স্থান হলেন মা। কিন্তু সেই মা-ই যদি সন্তানের সঙ্গে মিথ্যা বলেন, প্রতারণামূলক আর্থিক দেনা তৈরি করেন কিংবা মানসিক কষ্টের কারণ হন—তখন সন্তানের মনের অবস্থা কেমন হয়? মাতৃত্বের সুউচ্চ মর্যাদার কারণে তখন এক জটিল নৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। 

এমন সংবেদনশীল পারিবারিক সংকটে সন্তানের করণীয় কী? কীভাবে সম্মান বজায় রেখে এই অন্যায়ের প্রতিকার করা যায়? ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। একদিকে ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়, অন্যদিকে যে কারও প্রতারণাকে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে।

পিতা-মাতার ভুলত্রুটি নীরবে সহ্য করে নিজেকে ও সন্তানদের সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া ইসলামের আদব নয়; বরং প্রজ্ঞা, নম্রতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সীমারেখা নির্ধারণ করাই ইসলামের নির্দেশ।

ইসলাম পিতা-মাতাকে নিষ্পাপ বলে ঘোষণা করেনি। বয়সের ভার, একাকীত্ব কিংবা মানসিক বিচ্যুতির কারণে অনেক সময় পিতা-মাতা আর্থিক লোভ বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

মায়ের মর্যাদা ও মানবিক সীমাবদ্ধতা

ইসলামে মায়ের স্থান সবার ঊর্ধ্বে। এক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম সাহচর্য পাওয়ার সর্বাধিক হকদার কে?’ তিনি তিনবার বললেন, ‘তোমার মা’; অতঃপর চতুর্থবারে বললেন, ‘তোমার পিতা’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)

কোরআনে পিতামাতার সঙ্গে সর্বদা কোমল ভাষায় কথা বলার এবং সামান্য ‘উহ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)।

তবে ইসলাম পিতা-মাতাকে নিষ্পাপ (মাসুম) বলে ঘোষণা করেনি। বয়সের ভার, একাকীত্ব কিংবা মানসিক বিচ্যুতির কারণে অনেক সময় পিতা-মাতা আর্থিক লোভ বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

মুমিন সন্তানের দায়িত্ব হলো—ব্যক্তি মায়ের প্রতি হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও দয়া বজায় রাখা, কিন্তু তাঁর পাপ বা অন্যায় কর্মকাণ্ডকে কোনো অবস্থাতেই মেনে বা প্রশ্রয় না দেওয়া।

আরও পড়ুন

ভরণপোষণের ফিকহি অগ্রাধিকার

ফিকহশাস্ত্রে ভরণপোষণের একটি সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার কাঠামো রয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকে, তখন তার উপার্জিত সম্পদের ওপর সর্বপ্রথম নিজের এবং নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ক পোষ্য সন্তানদের হক বর্তায়; এরপর উদ্বৃত্ত থাকলে পিতা-মাতার দায়িত্ব আসে।

ইমাম নববী (রহ.) ইসলামের সর্বসম্মত অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, “কোনো ব্যক্তির আর্থিক সঙ্গতি যদি সীমিত হয় এবং সে সবার খরচ একসঙ্গে চালাতে অপারগ হয়, তবে আলেমদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ইজমা) অনুযায়ী অগ্রাধিকারের ক্রম হবে: প্রথমে নিজের প্রয়োজন, দ্বিতীয়ত নিজের নাবালক সন্তান ও স্ত্রীর ভরণপোষণ, এবং এরপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ।” (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহি মুসলিম,  ৭/৮২–৮৪, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)

পিতা-মাতা তখনই সন্তানের সম্পদ থেকে নিতে পারেন যখন তাঁরা বাস্তব অর্থেই অভাবগ্রস্ত হন, এবং সেই গ্রহণ যেন কোনো অবস্থাতেই সন্তানের ক্ষতিসাধন না করে কিংবা সন্তানের ওপর ঋণ ও দেনার বোঝা চাপিয়ে না দেয়।
ইবনে কুদামাহ আল–মাকদিসি (রহ.)

সন্তানের সম্পদে পিতা-মাতার অধিকারের সীমা

নবীজি একটি হাদিসে সন্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন “তুমি ও তোমার সম্পদ তোমার পিতার।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৯১)

অনেকে এই হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা করে মনে করেন পিতা-মাতা সন্তানের সম্পদে যেভাবে ইচ্ছা তছরুপ করতে পারেন। কিন্তু চার মাজহাবের ফকিহগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত যে এই অধিকার শর্তহীন নয়।

হাম্বলি মাজহাবের শীর্ষস্থানীয় ফকিহ ইমাম ইবনে কুদামাহ (রহ.) উল্লেখ করেছেন, পিতা-মাতা তখনই সন্তানের সম্পদ থেকে নিতে পারেন যখন তাঁরা বাস্তব অর্থেই অভাবগ্রস্ত হন, এবং সেই গ্রহণ যেন কোনো অবস্থাতেই সন্তানের ক্ষতিসাধন না করে কিংবা সন্তানের ওপর ঋণ ও দেনার বোঝা চাপিয়ে না দেয়। (ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ৮/২৭২–২৭৫, দারু আলমিল কুতুব, রিয়াদ, ১৯৯৭ খ্রি.)

অনুরূপভাবে হানাফি মাজহাবের প্রামাণ্য গ্রন্থ ফাতাওয়া শামিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে পিতা-মাতার জন্য সন্তানের সম্পদে অনধিকার চর্চা, মিথ্যাচার বা প্রতারণামূলক দেনা তৈরি করা সম্পূর্ণরূপে হারাম। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলা আদ–দুররিল মুখতার, ৩/৬২১–৬২৪, দারুল ফিকর, বৈরুত)

আরও পড়ুন

ক্ষতি নিরসনে আইনি সুরক্ষা গ্রহণ

মা যদি সন্তানের নাম ব্যবহার করে কোনো জালিয়াতি, ভুয়া ঋণ বা আর্থিক কেলেঙ্কারি করেন, তবে তা মুখ বুজে মেনে নেওয়া তাকওয়া নয়। ইসলামি ফিকহের একটি মূলনীতি হলো, ‘ক্ষতি অবশ্যই দূরীভূত করতে হবে’।

এই মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্যের অনিষ্টের শিকার হয়ে নিঃস্ব হতে পারে না। (ইমাম সুয়ুতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ির, পৃষ্ঠা: ৮৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

নবীজি বলেছেন, “ইসলামে নিজের ক্ষতি করা যেমন বৈধ নয়, অন্য কারো ক্ষতিসাধন করাও বৈধ নয়।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)

তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন, “স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোনো সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০৯৫)

অতএব, মা যেন ভবিষ্যতে সন্তানের পরিচয়পত্র বা ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে কোনো প্রতারণা করতে না পারেন, সে জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আলাদা করা কিংবা আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা কোনো শিষ্টাচার বহির্ভূত নয়; বরং এটি ইসলামসম্মত অপরিহার্য আত্মরক্ষা।

আইনি ও বাস্তবিক সুরক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি সন্তানের উচিত মায়ের সঙ্গে মমতা নিয়ে মুখোমুখি কথা বলা। পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতিই অনেক সময় সম্পর্কের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ায়।

সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে খোলামেলা আলোচনা

আইনি ও বাস্তবিক সুরক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি সন্তানের উচিত মায়ের সঙ্গে মমতা নিয়ে মুখোমুখি কথা বলা। পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতিই অনেক সময় সম্পর্কের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ায়।

একই সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, মা কেন এমন করছেন? প্রবীণ বয়সে স্বামী হারানোর পর নিরাপত্তাহীনতার ভয় থেকেও মানুষ অনেক সময় অর্থ কুক্ষিগত করতে চায়। সন্তান যদি মায়ের মৌলিক খাবার, ওষুধ ও মর্যাদাপূর্ণ হাতখরচের নিশ্চয়তা দেয় এবং তাঁকে নিয়মিত সময় ও মানসিক সঙ্গ প্রদান করে, তবে মায়ের এই মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি অনেকটাই দূর হতে পারে।

পিতামাতার প্রতি সদাচরণ (ইহসান) ইসলামের এক মহান স্তম্ভ, তবে সেই সদাচরণের সীমানা কখনোই জুলুম, জালিয়াতি বা নিজের সন্তানদের ধ্বংসের কারণ হতে পারে না।

মায়ের ব্যক্তিগত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে, তাঁর জন্য দোয়া ও সেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাঁর অন্যায় আর্থিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করাই কোরআন, সুন্নাহ ও প্রামাণ্য ফিকহের অকাট্য বিধান।

আরও পড়ুন