ইউরিন ব্যাগ লাগানো অবস্থায় কি অজু করা যায়

ছবি: পেক্সেলস

অসুস্থতার কারণে অনেককে দীর্ঘদিন ক্যাথেটার ব্যবহার করতে হয়। মূত্রথলিতে সংযুক্ত ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রস্রাব একটি নলের সাহায্যে ইউরিন ব্যাগে জমা হতে থাকে।

এ সময় অজু কীভাবে করবেন, ব্যাগে প্রস্রাব জমে থাকলে অজু হবে কি না, অজুর পর আবার প্রস্রাব ব্যাগে চলে গেলে অজু থাকবে কি না—এসব বিষয় নিয়ে অনেকে চিন্তিত থাকেন।

ইসলাম মানুষের সামর্থ্যের বাইরে কোনো বিধান চাপিয়ে দেয়নি। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

অনিয়ন্ত্রিতভাবে নাপাকি বের হওয়ার সমস্যায় শরিয়ত বিশেষ বিধান রেখেছে। ক্যাথেটার-নির্ভর রোগীর ক্ষেত্রেও এসব বিধান প্রযোজ্য হবে।

ক্যাথেটার-নির্ভর রোগী সাধারণত অপারগ ব্যক্তির বিধানের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, ক্যাথেটার এমন রোগীর জন্যই ব্যবহার করা হয়, যার প্রস্রাব স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

ক্যাথেটার ব্যবহারকারী অপরাগ

ক্যাথেটার-নির্ভর রোগী সাধারণত অপারগ ব্যক্তির বিধানের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, ক্যাথেটার এমন রোগীর জন্যই ব্যবহার করা হয়, যার প্রস্রাব স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

তবে হানাফি ফিকহে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানদণ্ড হলো, একটি পূর্ণ ফরজ নামাজের ওয়াক্ত এমনভাবে অতিবাহিত হওয়া, যাতে অজু করে ফরজ নামাজ আদায় করার মতো অপবিত্রতামুক্ত সময় থাকে না। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৪, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

আরও পড়ুন

প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু

মাজুর ব্যক্তির জন্য সাধারণ মানুষের অজুর বিধান থেকে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। তিনি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর অজু করবেন। যেমন, জোহরের ওয়াক্ত শুরু হলে অজু করে জোহরের নামাজ আদায় করবেন। সেই অজু দিয়ে ওই ওয়াক্তের ফরজ, সুন্নত, নফলসহ অজু প্রয়োজন এমন অন্যান্য ইবাদত করতে পারবেন।

একই অজু দিয়ে ওই ওয়াক্তে একাধিক নামাজও আদায় করা যাবে। ওয়াক্ত শেষ হলে পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য নতুন অজু করতে হবে। যেমন, আসরের ওয়াক্ত শুরু হলে আসরের জন্য নতুন অজু করবেন। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৫ ও ৫০৭, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

হাদিসে এসেছে, ফাতিমা বিনতে আবি হোবাইশের অনবরত রক্তস্রাব হলে তিনি নবীজিকে নামাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন।

নামাজের আগে ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমে থাকলে, তা খালি করা সম্ভব হলে এবং এতে রোগীর কোনো কষ্ট বা চিকিৎসাগত সমস্যা না হলে খালি করে নেওয়া উচিত।

রাসুল (সা.) তাঁকে নামাজ ছেড়ে দিতে বলেননি, বরং পবিত্র হয়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেন। বর্ণনার শেষে এসেছে, ‘এরপর তুমি প্রত্যেক নামাজের জন্য অজু করবে, যতক্ষণ না পরবর্তী ওয়াক্ত আসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৮)

এই হাদিসের আলোকে ফকিহরা ধারাবাহিক ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে নতুন অজুর বিধানের কথা উল্লেখ করেছেন।

অজুর পর ব্যাগে প্রস্রাব গেলে

ক্যাথেটার ব্যবহারকারী মাজুর ব্যক্তি অজু করার পর ওই ওয়াক্তের মধ্যে ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রস্রাব ব্যাগে যেতে থাকলেও সাধারণ মানুষের মতো তাঁর অজু নষ্ট হবে না। কারণ যে সমস্যার কারণে তাঁকে মাজুরের বিধান দেওয়া হয়েছে, শরিয়ত ওই নির্দিষ্ট ওজরের ব্যাপারে তাকে ছাড় দিয়েছে।

তবে এই ছাড় শুধু ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রস্রাব বের হওয়ার ক্ষেত্রে। অন্য কোনো কারণ পাওয়া গেলে (যেমন পায়খানা, বায়ু নির্গমন, ঘুম ইত্যাদি) অজু ভেঙে যাবে এবং পুনরায় অজু করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৭, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

আরও পড়ুন

ব্যাগ খালি করতে হবে কি

নামাজের আগে ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমে থাকলে, তা খালি করা সম্ভব হলে এবং এতে রোগীর কোনো কষ্ট বা চিকিৎসাগত সমস্যা না হলে খালি করে নেওয়া উচিত। হানাফি ফিকহে ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও নাপাকি কমানো এবং তা অপসারণের সামর্থ্য থাকলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু ব্যাগ খালি করতে গেলে যদি ক্যাথেটার খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, ব্যথা হয়, চিকিৎসকের নির্দেশের পরিপন্থী হয় কিংবা এতে রোগীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে শুধু নামাজের জন্য ক্যাথেটার বা ব্যাগ খুলতে হবে না।

কারণ, এটি রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অংশ। প্রয়োজনের কারণে শরীরে যুক্ত থাকা অবস্থায় ব্যাগসহ নামাজ আদায় করা বৈধ। এমনকি ব্যাগটি নিরাপদে আবৃত ও সুরক্ষিত থাকলে এবং মসজিদ অপবিত্র হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে, শুধু ব্যাগে অপবিত্রতার থাকার কারণে তাঁকে মসজিদে প্রবেশ থেকে বিরত রাখা হবে না। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়িক শারহ কানজ আদ-দাকায়িক, ১/৩৭৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমা হওয়া আর প্রস্রাব বাইরে বের হয়ে শরীর বা পোশাকে লাগা এক বিষয় নয়। বাইরে লিক হলে সাধারণ অবস্থায় অপবিত্রতা দূর করার বিধান রয়েছে।

শরীর বা পোশাকে প্রস্রাব লাগলে

ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমা হওয়া আর প্রস্রাব বাইরে বের হয়ে শরীর বা পোশাকে লাগা এক বিষয় নয়। বাইরে লিক হলে সাধারণ অবস্থায় অপবিত্রতা দূর করার বিধান রয়েছে। তাই রোগীর সাধ্য অনুযায়ী ক্যাথেটার ও ব্যাগ এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রস্রাব ছড়িয়ে না পড়ে।

তবে মাজুর ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি লিকেজ এমন হয় যে, পরিষ্কার করার পর আবারও অল্প সময়ের মধ্যে পোশাক নাপাক হয়ে যায় এবং প্রতিবার তা ধোয়া বাস্তবে কষ্টকর হয়ে পড়ে, তাহলে প্রত্যেক নামাজের আগে কাপড় ধোয়া বা বারবার পরিবর্তন করা আবশ্যক নয়। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়িক শারহ কানজ আদ-দাকায়িক, ১/৩৭৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

আরও পড়ুন