বিশ্বনবীর পাখিপ্রেম

ছবি: পেক্সেলস

মহান আল্লাহ মানবজাতিকে এ পৃথিবীতে জীবন ধারণের জন্য অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। পশু-পাখি ওই সব নেয়ামতেরই অংশবিশেষ। মানুষের একান্ত প্রয়োজনেই পশুপাখি সৃষ্টি করা হয়েছে। ভাষাভিত্তিক বা ভাষাহীন নিরীহ এই পশুপাখির প্রতি সদয় হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

প্রিয় নবী (সা.) আল্লাহর অপূর্ব সৃষ্টি পাখিদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আল্লাহর এ অনুপম সুন্দর সৃষ্টির প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ ও অনুকম্পা। শুধু তা-ই নয়, আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টির প্রতিই ছিল তাঁর অগাধ প্রেম ও ভালোবাসা।

পাখির প্রতি দয়া

জাহেলিয়ার যুগে বর্বর আরব জাতির মধ্যে পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করা হতো। নবীজির কোমল হৃদয়ে সেসব ঘটনায় কঠিন আঘাত লাগত।

একবার প্রিয় নবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে বসে ইসলাম প্রচারের পরামর্শ করছিলেন। এমন সময় একজন সাহাবি একটি পাখির কয়েকটি ছানা ধরে নিয়ে হাজির হলেন। আর সেই সাহাবির মাথার ওপর দিয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মা পাখিটি কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে আসছিল।

একটি পাখি এসে সেখানে ডিম পেরেছিল। জনৈক ব্যক্তি ডিমটি উঠিয়ে নিলে পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে তার গভীর মর্মযাতনা প্রকাশ করতে লাগল।
আরও পড়ুন

নির্মম এই দৃশ্য নবীজির দৃষ্টিগোচর হতেই তাঁর অন্তর ব্যথিত হয়। সন্তানহারা মা পাখিটির আহাজারি যেন নবীজির কোমল হৃদয়ে আঘাত হানল।

দয়ার নবীর কষ্ট পাওয়া চেহারা দেখে সেই সাহাবি বিষয়টি আঁচ করতে পেরে দ্রুত ফিরে গিয়ে পাখির ছানাগুলো আগের জায়গায় রেখে এলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৭৫)

সব ভাষাহীন প্রাণীর প্রতি স্নেহ-মমতা রাখা আমাদের কর্তব্য। তাদের উত্যক্ত করা বা হত্যা করা উচিত নয়।

একবার মহানবী (সা.) সাহাবিদের নিয়ে এক সফরে যাচ্ছিলেন। পথে এক জায়গায় বিশ্রামের জন্য তাঁরা থামলেন। একটি পাখি এসে সেখানে ডিম পেরেছিল। জনৈক ব্যক্তি ডিমটি উঠিয়ে নিলে পাখিটি ডানা ঝাপটিয়ে তার গভীর মর্মযাতনা প্রকাশ করতে লাগল।

নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডিম ছিনিয়ে নিয়ে কে পাখিটির দুঃখের কারণ ঘটিয়েছে?’ এক ব্যক্তি বললেন, ‘কাজটি আমি করেছি।’ তখন তিনি বললেন, ‘ডিমটি যেখানে ছিল, সেখানে আবার রেখে দাও।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৩৯৮১)

আবু ওমর আশ-শাইবানি (রা.) থেকে বলেন, একবার এক সফরে কাফেলা অবস্থান করার সময় একটি চড়ুই পাখি তাঁদের মাথার ওপর চুঁ চুঁ করে উড়ছিল। নবীজি এ দৃশ্য দেখে অস্থিরতা প্রকাশ করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এক সাহাবি চড়ুই পাখির বাসা থেকে তার ছানা নিয়ে এসেছেন।

আরও পড়ুন
নবীজি ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বা জীবিত নিশানা বানায়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৮

নবীজি পাখির ছানা তার বাসায় রেখে আসার নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘এই চড়ুই পাখির তার ছানার প্রতি যতটা মমতা রয়েছে, বান্দার প্রতি আল্লাহর মমতা তার চেয়ে ঢের বেশি।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩৫০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)

নবীজি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো চড়ুই পাখি মেরে ফেলবে, সেই চড়ুই কেয়ামতের দিন অভিযোগ করবে এবং বলবে, ‘এ ব্যক্তি আমাকে অকারণে হত্যা করেছে। আমার দ্বারা কারও কোনো উপকার হয়নি, এ ব্যক্তিও আমার থেকে উপকৃত হয়নি এবং সে আমাকে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়নি।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪৪৯৫)

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সতর্কতা

একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কোরাইশ গোত্রের একদল বালককে দেখতে পেলেন যে তারা একটি পাখিকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তির নিক্ষেপ করে শিকার করছে।

এটা দেখে ইবনে ওমর তাদের তিরস্কার করে পৃথক করে দেন এবং বলেন, ‘নবীজি ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বা জীবিত নিশানা বানায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৮)

এমনিভাবে বিশ্বনবীর জীবনের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তিনি আল্লাহর সৃষ্টিজগতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তাই তো তিনি আল্লাহ কর্তৃক ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ খেতাবে ভূষিত হয়ে সারা জাহানে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

  • সাকী মাহবুব: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, রাজবাড়ী

আরও পড়ুন