‘সৎকর্মে তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো’

সহযোগিতার মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ভালোবাসা ও একতা বৃদ্ধি পায়, একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠেছবি: ফ্রিপিক

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)

আমাদের সময়ে যখন ভালো কাজ কমে আসছে আর মন্দ ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই নির্দেশনা মেনে চলা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। কল্যাণকে বাড়ানো, অকল্যাণকে সীমিত রাখা, ধর্মের কাজকে দাঁড় করানো, সংস্কারকদের শক্তিশালী করা এবং ফ্যাসাদকারীদের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার জন্যই এই সহযোগিতা দরকার।

‘বির’ ও ‘তাকওয়া’র মধ্যে পার্থক্য

উপর্যুক্ত আয়াতে সৎকর্ম বলতে ‘বির’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বির আর তাকওয়া—ইসলাম আর ইমানের মতোই এমন দুটি শব্দ, যেগুলো আলাদা করে বললে একই অর্থ বহন করে, আবার একসঙ্গে বললে দুটির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, বির আর তাকওয়া মূলত একই অর্থ বহন করে। প্রতিটি বিরই তাকওয়া আর প্রতিটি তাকওয়াই বির। বির বলতে বোঝায় ফরজ ও মুস্তাহাব দুটিই, আর তাকওয়া বলতে বোঝায় শুধু ফরজ পালন করা। (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ৬/৪৭)

সহযোগিতার মাধ্যমে এমন সব লক্ষ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যা একা করতে গেলে না–ও পারতে পারে। দায়িত্বও বহু মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। আর এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ভালোবাসা ও একতা বৃদ্ধি পায়, একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠে।

শাইখ সাদি লেখেন, বির হলো এমন একটি ব্যাপক শব্দ, যাতে আল্লাহর পছন্দ ও সন্তুষ্টির সব কাজ—প্রকাশ্য বা গোপন, আল্লাহর হক হোক বা বান্দার হক—অন্তর্ভুক্ত। আর এই আয়াতে তাকওয়া মানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা অপছন্দ করেন, তা প্রকাশ্যে ও গোপনে বর্জন করা। (তাইসিরুল কারিমির রহমান, ২/২৩৮)

ইবনুল কাইয়িম বলেন, এই দুটির পার্থক্য অনেকটা এমন—একটি হলো উপায়, অন্যটি লক্ষ্য নিজেই। বির নিজেই কাঙ্ক্ষিত, কারণ, এটাই বান্দার পূর্ণতা ও সংশোধন, যা ছাড়া তার কোনো সংশোধন সম্ভব নয়। আর তাকওয়া সেই বির পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ ও মাধ্যম। (জাদুল মুহাজির)

আরও পড়ুন

এই সহযোগিতার অর্থ

সহযোগিতা বলতে এখানে ‘ইয়ানাহ’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে; যার অর্থ সাহায্য, সমর্থন ও পক্ষে দাঁড়ানো। ‘তাআওয়ুনুল কাউম’ মানে একদল লোকের একে অপরকে সাহায্য করা। আলেমদের ব্যাখ্যাগুলো মূলত একটি সাধারণ অর্থে গিয়ে মেলে।

প্রত্যেকে জ্ঞান ও কাজ উভয় দিক থেকে অপরকে সহযোগিতা করবে।

সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এর অর্থ হলো নিজে সেই কাজ করা, অন্যকে তার দিকে ডাকা, তাতে সহায়তা করা আর পথ দেখানো। (হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৭/২৮৪)

ইমাম কুরতুবি লেখেন, অর্থাৎ তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, আল্লাহর নির্দেশিত কাজে একে অপরকে উৎসাহ দাও এবং তা পালন করো, আর আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো ও অপরকেও বিরত রাখো। এটা নবীজির (সা.) সেই কথার সঙ্গেও মিলে যায়—‘যে ভালো কাজের পথ দেখায়, সে যেন নিজেই তা করল।’ (আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ৩/৩৩)

সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।
সুরা মায়িদা, আয়াত: ২

এই সহযোগিতার গুরুত্ব

সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করা আল্লাহর নির্দেশ। মুসলিমরা যখন এতে সহযোগিতা করে, তখন তারা আসলে আল্লাহর হুকুম মেনে চলে আর রাসুলের আনুগত্য করে।

এই সহযোগিতার মাধ্যমে এমন সব লক্ষ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যা একা করতে গেলে না–ও পারতে পারে। দায়িত্বও বহু মানুষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। আর এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ভালোবাসা ও একতা বৃদ্ধি পায়, একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠে।

মুমিনদের মধ্যে এই সহযোগিতা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে নবী-রাসুলরা পর্যন্ত আল্লাহর কাছে সহায়ক চেয়েছেন। মুসা (আ.) বলেছিলেন, ‘আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে স্পষ্টভাষী, তাকে আমার সহায়করূপে পাঠান, যে আমাকে সত্যায়ন করবে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৪)

আল্লাহ তাঁর এই প্রার্থনা কবুল করে বলেন, ‘আমি তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার শক্তি বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৫)

ইসা ইবনু মারিয়াম (আ.) হাওয়ারিদের বলেছিলেন, ‘আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে।’ (সুরা সাফ, আয়াত: ১৪)।

ইবনে কাসির ব্যাখ্যা করেন যে এর অর্থ, কে আল্লাহর পথে দাওয়াতের কাজে আমাকে সহযোগিতা করবে (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৮৫)

নবীজি (সা.) যখন উকাজ ও মাজান্নার মেলায় এবং মিনায় হজের মৌসুমে গোত্রে গোত্রে গিয়ে বলতেন, ‘কে আমাকে আশ্রয় দেবে? কে আমাকে সাহায্য করবে, যাতে আমি আমার রবের বার্তা পৌঁছে দিতে পারি? তার জন্য জান্নাত রয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯২৫)

এই আশ্রয়দানও ছিল নেকি আর তাকওয়ায় সহযোগিতার একটি রূপ। আর এই সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন আনসাররা, যাঁরা নবীজিকে সবচেয়ে বড় সহায়তা দিয়েছিলেন এবং শারীরিক, আর্থিক—সব দিক থেকেই তাঁর নির্দেশ মেনে চলেছিলেন।

আরও পড়ুন

সহযোগিতার ক্ষেত্র কী কী

এই সহযোগিতার পরিসর এতটাই বিশাল যে তা গণনা করে শেষ করা যায় না। যেহেতু বির বলতে বোঝায় আল্লাহর পছন্দের সব কাজ, তাই সেসব কাজে সহযোগিতা করা, সেগুলো প্রতিষ্ঠা করা এবং টিকিয়ে রাখাও এই সহযোগিতার অংশ।

আবার তাকওয়া মানে আল্লাহর অপছন্দের সব কাজ বর্জন করা, তাই এই বর্জনে একে অপরকে সাহায্য করাও নেকি-তাকওয়ায় সহযোগিতারই অন্তর্ভুক্ত।

এ ছাড়া মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, উত্তম চরিত্র, ভালো কাজ ও সুন্দর আচরণের দিকে আহ্বান জানানোয় একে অপরকে সহযোগিতা করা। ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা ও মানুষের অন্তরে ধর্মের নিদর্শনগুলোকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরায় সহযোগিতা করাও এর অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর সম্মান রক্ষা করে, তা তার প্রতিপালকের কাছে তার জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা হাজ্জ, আয়াত: ৩০)। আরও বলেন, ‘যে আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সম্মান করে, তা তো অন্তরের তাকওয়া থেকেই আসে।’ (সুরা হাজ্জ, আয়াত: ৩২)

মুসলিমদের হক আদায়ে সহযোগিতার পরিসর এত বিশাল যে এতে অসংখ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত। সংক্ষেপে বলা যায়, এই ছোট্ট আয়াতটি প্রতিটি সুন্দর ও ভালো কাজে সহযোগিতার নির্দেশ একসঙ্গে ধারণ করে রেখেছে।

মসজিদ নির্মাণ, ইসলামি আলোচনার আয়োজন, জ্ঞান বিতরণ, অজ্ঞ মানুষকে শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের অজ্ঞতা ও কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধরা—এসবও এতে পড়ে। একইভাবে, বিশেষত দরিদ্র মুসলিমদের সেবায় দাতব্য হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলাও এই সহযোগিতারই একটি রূপ।

দরিদ্র ছাত্র, আলেম ও দাঈদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া, তাদের পেছনে অর্থ ব্যয় করা এবং তাদের পড়াশোনা, শিক্ষাদান ও দাওয়াতের কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।

জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ওমর (রা.) তাঁর প্রতিবেশী আনসারি সাহাবি আউস ইবনু খাওলির সঙ্গে হাদিস শোনার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। ওমর (রা.) বলেন, ‘আমি আর আমার এক আনসারি প্রতিবেশী বনু উমাইয়া ইবনে জায়েদ এলাকায় থাকতাম, যা মদিনার উঁচু অংশে অবস্থিত। আমরা পালা করে নবীজির কাছে যেতাম। এক দিন তিনি যেতেন, এক দিন আমি। যেদিন আমি যেতাম, সেদিনের সব খবর এসে তাঁকে জানাতাম, আর যেদিন তিনি যেতেন, তিনিও একই কাজ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯)

আবু মুসা আশআরি (রা.) এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ওপর রহম করুন, তোমরা লক্ষ করো, বুঝেশুনে নামাজ প্রতিষ্ঠিত করো, তাতে আল্লাহকে ভয় করো, একে অপরকে সহযোগিতা করো, একে অপরকে নসিহত করো। কেউ কিছু ভুলে গেলে বা অসতর্ক হলে তা মনে করিয়ে দাও। কারণ, আল্লাহ তোমাদের নেকি ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করতে বলেছেন, আর নামাজই তো সর্বোত্তম নেকি।’ (তাবাকাতুল হানাবিলা, ১/৩৫৪)

মোটকথা, মুসলিমদের হক আদায়ে সহযোগিতার পরিসর এত বিশাল যে এতে অসংখ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত। সংক্ষেপে বলা যায়, এই ছোট্ট আয়াতটি প্রতিটি সুন্দর ও ভালো কাজে সহযোগিতার নির্দেশ একসঙ্গে ধারণ করে রেখেছে।

আরও পড়ুন