ইসলামি ইতিহাসে নারী সাহাবিদের ভূমিকা কেবল ইবাদত-বন্দেগি বা ঘরোয়া কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁরা জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশাগত ও কারিগরি কাজেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।
পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা, অভাব মোচন এবং নিজের উপার্জন থেকে সদকা করার মহান উদ্দেশ্যে তাঁরা বিভিন্ন হস্তশিল্প, ব্যবসা ও কৃষি কাজে যুক্ত হতেন।
তাঁদের এই কর্মতৎপরতা প্রমাণ করে, শরিয়তের পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে নারীদের পেশাগত কাজে যুক্ত হওয়া ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে স্বীকৃত।
পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করা, অভাব মোচন এবং নিজের উপার্জন থেকে সদকা করার মহান উদ্দেশ্যে তাঁরা বিভিন্ন হস্তশিল্প, ব্যবসা ও কৃষি কাজে যুক্ত হতেন।
কারিগরি ব্যবস্থাপনা
নারী সাহাবিরা কেবল সাধারণ শ্রমই দিতেন না, বরং কাজের তদারকি ও ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত ছিলেন। হাদিসের একটি বর্ণনা মতে, এক আনসারী নারী নবীজির কাছে এসে বলেছিলেন, “আমার একজন দাস (শ্রমিক) আছে যে কাঠমিস্ত্রির কাজ জানে।”
পরে তাঁর নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে সেই শ্রমিক বনের ঝাউগাছ কেটে নবীজির জন্য মিম্বর তৈরি করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৯৪)
বোঝা যায়, নারীরা সেই সময়ে নির্মাণ ও কারিগরি কাজের স্বত্বাধিকারী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে ভূমিকা রাখতেন।
কৃষি ও উদ্যানতত্ত্ব
কৃষিকাজেও নারী সাহাবিদের অংশগ্রহণ ছিল। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, তাঁর খালার বিচ্ছেদ হলে তিনি নিজের খেজুর বাগান থেকে খেজুর সংগ্রহ করতে বাইরে যেতে চেয়েছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বাইরে যেতে নিষেধ করলে তিনি নবীজির কাছে যান।
রাসুল (সা.) তাকে অনুমতি দিয়ে বলেন, “অবশ্যই তুমি তোমার খেজুর সংগ্রহ করবে। আশা করা যায় এর মাধ্যমে তুমি দান-সদকা করতে পারবে বা কোনো ভালো কাজ করতে পারবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৮০)
আমি একজন শ্রমজীবী নারী। আমি নিজের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রি করি। অথচ আমার, আমার স্বামী বা সন্তানের তেমন কোনো সম্পদ নেই।
হাদিসে এখানে ‘জাদ’ শব্দের উল্লেখ আছে, যা খেজুর পাড়া বা কাটার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা একটি শ্রমসাধ্য কাজ। (ইমাম কুরতুবি, তাফসিরুল কুরতুবি, ১৪/২৩০, মুয়্যাসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০৬)
গৃহশিল্প ও হস্তশিল্প
অনেক নারী সাহাবি ঘরে বসে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের স্ত্রী জয়নব (রা.) ছিলেন দক্ষ কারিগর। তিনি নবীজিকে বলেছিলেন, “আমি একজন শ্রমজীবী নারী। আমি নিজের হাতে তৈরি পণ্য বিক্রি করি। অথচ আমার, আমার স্বামী বা সন্তানের তেমন কোনো সম্পদ নেই।”
তিনি তাঁদের পেছনে খরচ করার সওয়াব সম্পর্কে জানতে চাইলে নবীজি (সা.) তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে পরিবারের পেছনে খরচের সওয়াবেও তিনি সমান অংশীদার। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪২৪৭)
এ ছাড়া চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেলাইয়ের কাজেও অনেক নারী সাহাবি যুক্ত ছিলেন।
পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেবা প্রদান
তখন নারীরা নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে দুধ দান (বুকের দুধ খাওয়ানো) ও শিশু পালনের কাজও করতেন। কোরআনেও এর ইঙ্গিত রয়েছে, “যদি তারা তোমাদের সন্তানদের স্তন্যদান করে, তবে তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” (সুরা তালাক, আয়াত: ৬)
এটি তৎকালীন সময়ে নারীদের জন্য একটি স্বীকৃত ও সম্মানজনক পেশা ছিল।
যুদ্ধের ময়দানে আহতদের সেবা ও তৃষ্ণার্তদের পানি পান করানোর কাজেও নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন।
পশু পালন ও চিকিৎসা সেবা
মদিনার পাহাড়-পর্বতে নারীর সেকালে গবাদি পশু চড়াতেন। কাব ইবনে মালিকের (রা.) এক দাসীর কথা আছে, যিনি ‘সাল’ নামের পাহাড়ে ছাগল চরাতেন। একবার একটি ছাগল মারা যাওয়ার উপক্রম হলে তিনি পাথর দিয়ে সেটি জবাই করেন এবং নবীজি (সা.) সেই মাংস খাওয়ার অনুমতি দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫০৪)
এ ছাড়া তারা প্রাথমিক চিকিৎসা ও ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমেও সেবা দিতেন। বিষাক্ত প্রাণীর কামড় বা কান ব্যথার মতো সমস্যায় আনসারী নারীদের ঝাড়ফুঁক করার বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৪১)
এমনকি যুদ্ধের ময়দানে আহতদের সেবা ও তৃষ্ণার্তদের পানি পান করানোর কাজেও নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। (জাসিম বিন মুহালহিল আল-ইয়াসিন, ফিকহুল মারআহ আল-মুসলিমাহ, ১/১৫২, দারুদ দাওয়াহ, কুয়েত)
ইসলামি আদর্শ ও শালীনতা রক্ষা করে নারীরা কৃষি, শিল্প, চিকিৎসা ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অবদান রাখতে পারেন। তাঁদের পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন কেবল পরিবারের সচ্ছলতাই ফেরাত না, বরং ইসলামের সেবায়ও ব্যয় হতো।