ইসলামি শরিয়তের প্রধান উৎস কী কী

ছবি: ফ্রিপিক

ইসলামি শরিয়ত বা আইনব্যবস্থা কোনো আকস্মিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি এক সুসংহত ও যৌক্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ভিত্তিমূলকে বলা হয় ‘উসুলুল ফিকহ’ বা শরিয়তের উৎস। শরিয়তের এই উৎসগুলো থেকে কীভাবে জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যার সমাধান বের করা যায়, তা নিয়েই ইসলামি আইনের বিশাল ইমারত দাঁড়িয়ে আছে।

‘উৎসের’ সংজ্ঞা ও তাৎপর্য

‘উৎস’ বা ‘দলিল’ বলতে আভিধানিক অর্থে এমন কিছুকে বোঝায় যা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পথপ্রদর্শন করে। ইসলামি পরিভাষায়, শরিয়তের উৎস হলো এমন সব মাধ্যম বা প্রমাণ, যার সঠিক পর্যালোচনার মাধ্যমে কার্যকর কোনো বিধান আহরণ করা সম্ভব হয়।

শরিয়ত বলতে সেই জীবনবিধানকে বোঝায় যা মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর মানুষের চেষ্টার মাধ্যমে সেই বিধান যখন প্রায়োগিক রূপ পায়, তখন তাকে বলা হয় ‘ফিকহ’। শরিয়ত হলো মূল কাঠামো, আর ফিকহ হলো তার ডালপালা বা প্রয়োগ। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, উসুলুল ফিকহিল ইসলামি, ১/২২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

ইসলামি শরিয়তের উৎসগুলোকে প্রধানত তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করা হয়েছে: ১. ঐকমত্যের ভিত্তিতে (সম্মত ও অসম্মত)। ২. উৎসের প্রকৃতির ভিত্তিতে (নকলি বা বর্ণনাভিত্তিক এবং আকলি বা যুক্তিনির্ভর)। ৩. স্বাধীনতার ভিত্তিতে (স্বতন্ত্র ও অনুগামী)।

সম্মতির ভিত্তিতে উৎসসমূহের শ্রেণিবিভাগ

ইসলামি আইনবিদদের মতে, শরিয়তের প্রধান উৎস চারটি, যার ওপর উম্মাহর অধিকাংশ আলেম একমত। এগুলো হলো, কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা (ঐকমত্য) ও কিয়াস (যৌক্তিক তুলনা)।

এর বাইরে আরও সাতটি উৎস রয়েছে যেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভিন্নতা আছে। সেগুলো হলো, ইস্তিহসান, মাসলাহা মুরসালাহ, ইস্তিসহাব, উরফ (প্রথা), সাহাবিদের মত, পূর্ববর্তী শরিয়ত এবং সাদ্দে যারায়ি (মন্দের পথ রোধ)।

মূলত ওহির ভিত্তিতে যদি বিবেচনা করা হয়, তবে শরিয়তের মূল উৎস দুটি, কোরআন ও সুন্নাহ। কোরআন হলো পঠিত ওহি, আর সুন্নাহ হলো অপঠিত ওহি। বাকি সব উৎস আসলে এই দুই মূল উৎসেরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা যৌক্তিক সম্প্রসারণ। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, উসুলুল ফিকহিল ইসলামি, ১/৪৫০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

আরও পড়ুন

প্রধান উৎসসমূহ: নির্দেশনা ও প্রয়োগ

শরিয়তের বিধান আহরণের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম অনুসরণ করা হয়। কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে প্রথমে কোরআন দেখা হয়, এরপর সুন্নাহ, তারপর ইজমা এবং সবশেষে কিয়াস।

আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠান, তখন এই ক্রমটিই অনুমোদিত হয়েছিল। আল্লাহর রাসুল তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কীভাবে বিচার করবে?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন, আল্লাহর কিতাব দিয়ে; সেখানে না পেলে আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ দিয়ে; আর সেখানেও না পেলে নিজের মেধা খাটিয়ে ইজতিহাদ করবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯২)

১. কোরআন: শরিয়তের আদি উৎস

কোরআন হলো শরিয়তের মূল ও প্রধান উৎস। এটি আল্লাহর কালাম, যা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। (সুরা হিজর, আয়াত: ৯)

শরিয়তের দলিল হিসেবে কোরআন অকাট্য (কাতয়ি)। কোরআন মানুষকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মানার আহ্বান জানায়। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪৯)

কোরআনের সব বিধান একই ধরনের নয়। কিছু বিধানের অর্থ একদম স্পষ্ট, যাকে বলা হয় ‘কাতয়ি আদ-দালালাহ’। যেমন নামাজ বা জাকাতের নির্দেশ। আবার কিছু বিধানের শব্দগত অর্থের মাঝে ব্যাখ্যা বা একাধিক অর্থের অবকাশ থাকে, যাকে বলা হয় ‘জন্নি আদ-দালালাহ’। ফকিহগণ এই দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেশ ও কালভেদে ইসলামের প্রয়োগ নির্ধারণ করেন।

২. সুন্নাহ: কোরআনের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা

আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কথা, কাজ এবং মৌন সম্মতিকে সুন্নাহ বলা হয়। সুন্নাহ তিন প্রকার, কওলি (মুখনিসৃত বাণী), ফে’লি (কর্ম) এবং তাকরিরি (মৌন সম্মতি)। যেমন আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই নিয়তের ওপর কাজের ফলাফল নির্ভর করে” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)। এটি একটি কওলি সুন্নাহ।

আবার তিনি নামাজ যেভাবে পড়েছেন তা হলো ফে’লি সুন্নাহ। অন্যদিকে, তাঁর সামনে কোনো কাজ করা হয়েছে কিন্তু তিনি বাধা দেননি, সেটি হলো তাকরিরি সুন্নাহ।

শরিয়তে সুন্নাহর অবস্থান দ্বিতীয়। সুন্নাহর অনুসরণ করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক (সুরা নিসা, আয়াত: ৮০)।

সুন্নাহ ছাড়া কোরআনের অনেক বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝা সম্ভব নয়। যেমন, কোরআনে নামাজের নির্দেশ আছে, কিন্তু নামাজের রাকাত বা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে সুন্নাহর মাধ্যমেই জানা যায়।

৩. ইজমা: আলেমদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত

কোনো যুগে মুসলিম উম্মাহর সব মুজতাহিদ বা গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণ যখন কোনো শরিয়তি বিষয়ের ওপর একমত হন, তাকে ইজমা বলা হয়। কোরআন ও সুন্নাহর পর এটি তৃতীয় প্রধান উৎস। কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯)।

সাহাবিদের যুগে অনেক বিষয়ে ইজমা হয়েছে, যেমন, দাদির উত্তরাধিকার নির্ধারণ বা আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতের বৈধতা।

আরও পড়ুন

৪. কিয়াস: যৌক্তিক তুলনা

যখন কোরআন, সুন্নাহ বা ইজমার সরাসরি কোনো সমাধান পাওয়া যায় না, তখন পূর্ববর্তী কোনো একই ধরনের বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করে নতুন সমস্যার সমাধান বের করা হয়। একেই বলা হয় কিয়াস।

কিয়াসের চারটি ভিত্তি রয়েছে: মূল বিষয় (আছল), নতুন বিষয় (ফারউ), মূল বিষয়ের বিধান (হুকুম) এবং উভয় বিষয়ের সাধারণ কারণ (ইল্লত)।

উদাহরণস্বরূপ, শরাব বা মদ কোরআনে হারাম করা হয়েছে কারণ এটি মাদকতা তৈরি করে। এখন আধুনিক যুগে যদি নতুন কোনো মাদক আবিষ্কৃত হয়, তবে কিয়াসের ভিত্তিতে সেটিও হারাম হবে কারণ তার মাঝেও 'মাদকতা' নামক সাধারণ কারণটি বিদ্যমান।

সহায়ক ও তাত্ত্বিক উৎসসমূহ

প্রধান চারটি উৎসের বাইরেও শরিয়তে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎস রয়েছে যা ইসলামের বিধানকে গতিশীল ও সময়োপযোগী করে তোলে।

ইস্তিহসান ও মাসলাহা মুরসালাহ

‘ইস্তিহসান’ মানে হলো বিশেষ কোনো দলিলে বা প্রয়োজনে সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে সহজতর সমাধান গ্রহণ করা। এটি মূলত ইসলামের সহজীকরণ নীতির প্রতিফলন। অন্যদিকে, ‘মাসলাহা মুরসালাহ’ হলো জনকল্যাণ বা সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষণ।

যদি কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো টেক্সট বা দলিল না থাকে, তবে জনস্বার্থ রক্ষার খাতিরে ফকিহগণ নতুন নিয়ম করতে পারেন। যেমন, কোরআনের পাণ্ডুলিপি একত্রে সংকলন করা বা জেলখানা তৈরি করা। সাহাবিরা জনস্বার্থেই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, উসুলুল ফিকহিল ইসলামি, ১/৭৫০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

ইসলাম মানুষকে ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয় না, বরং ক্ষতি নিবারণ করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪১)।

উরফ বা সামাজিক প্রথা

সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি বা প্রথাকেও ইসলাম শরিয়তের একটি উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যদি না তা কোরআন বা সুন্নাহর কোনো মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়। যেমন, দেনমোহরের কতটুকু নগদে দেওয়া হবে আর কতটুকু পরে দেওয়া হবে, তা সমাজের প্রচলিত নিয়মের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি ইসলামের এই নমনীয়তা শরিয়তকে সর্বজনীন করেছে।

ইস্তিসহাব ও সাদ্দে যারায়ি

‘ইস্তিসহাব’ হলো, কোনো কিছুর অস্তিত্ব অতীতে প্রমাণিত থাকলে বর্তমানেও তার বিপরীত কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে বিদ্যমান ধরে নেওয়া। যেমন, একজন মানুষ নিখোঁজ হলে তাকে মৃত প্রমাণ করার আগ পর্যন্ত জীবিত ধরে নেওয়া হবে এবং তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবে না।

অন্যদিকে, ‘সাদ্দে যারায়ি’ হলো এমন কোনো বৈধ কাজ নিষিদ্ধ করা যা পরিণামে কোনো হারামের দিকে নিয়ে যায়। যেমন, বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা হলে অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করা, কারণ এর ফলে রক্তপাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

ইসলামি শরিয়তের উৎসগুলো কেবল আইনি কাঠামো নয়, বরং এগুলো ইনসাফ ও দয়া নিশ্চিত করার হাতিয়ার। কোরআন ও সুন্নাহর চিরন্তন নীতির সঙ্গে মানুষের বিচারবুদ্ধি ও সামাজিক প্রয়োজনের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই উৎসগুলোর মাধ্যমে।

এর ফলেই আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগের আইন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং আধুনিক জীবনযাত্রার প্রতিটি বাঁকে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। শরিয়ত মূলত মানুষের কল্যাণ সাধন এবং অকল্যাণ দূর করার জন্যই প্রেরিত হয়েছে।

আরও পড়ুন