কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে ইসলামের বাস্তবমুখী ৪ পদক্ষেপ

দ্বিধাদ্বন্দ্বে মানুষ অনেক সময় দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়েছবি: পেক্সেলস

জীবনের নানা বাঁকে এসে আমাদের এমন কিছু কঠিন ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়, যার ওপর নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার, পরিবার ও সামগ্রিক শান্তি।

কোনটা বেছে নেওয়া ঠিক হবে আর কোনটা পরিহার করা উচিত—এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে মানুষ অনেক সময় দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়ে এবং এক ধরনের মানসিক উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। ইসলাম সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট ও সুসংহত একটি পথরেখা বাতলে দিয়েছে।

১. শান্ত থেকে যুক্তিবোধকে প্রাধান্য দেওয়া

যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম ও প্রধান কাজ হলো শান্ত থাকা এবং তাড়াহুড়ো না করা। আবেগ বা উত্তেজনার বশে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা মোটেও প্রজ্ঞার পরিচয় নয়।

ইসলামি জীবনদর্শনে কোনো বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণ ও স্থিরতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যখন আমরা না ভেবে কিংবা ক্ষণিকের আবেগে চালিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপে পা বাড়াই, তখন তা সমাধানের চেয়ে নতুন নতুন সংকটই বেশি তৈরি করে।

ওহুদ যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে সাহাবিদের বিচ্যুতির পরও তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ না হয়ে নবীজিকে আল্লাহ দয়া ও নম্রতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অস্থির হওয়ার ক্ষতির কথাও কোরআনে তুলে ধরেছেন। বলেছেন, “আল্লাহর অনুগ্রহেই আপনি তাদের প্রতি কোমলহৃদয় হয়েছেন। যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

নিজের একা ভাবনায় অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে; কিন্তু সমাজের হিতাকাঙ্ক্ষী, প্রজ্ঞাবান ও খোদাভীরু মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করলে বিষয়ের অনেক নতুন দিক উন্মোচিত হয়।
আরও পড়ুন

২. পরামর্শ করা

এরপর কাজ হলো অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করা। নিজের একা ভাবনায় অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে; কিন্তু সমাজের হিতাকাঙ্ক্ষী, প্রজ্ঞাবান ও খোদাভীরু মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করলে বিষয়ের অনেক নতুন দিক উন্মোচিত হয়। ইসলামি সংস্কৃতিতে পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শুরা’ খুবই বরকতময় এক প্রথা।

কোরআনে মুমিনদের অন্যতম প্রধান গুণ হিসেবে পরামর্শের চর্চাকে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “এবং যারা তাদের প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়েছে, নামাজ কায়েম করেছে, এবং যাদের যাবতীয় কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, আর আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।” (সুরা শুরা, আয়াত: ৩৮)

৩. ইস্তিখারা করে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া

নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে পরামর্শ করার পর পরবর্তী কাজ হলো আল্লাহ-তাআলার বিশেষ পথনির্দেশ ও হেদায়েত প্রার্থনা করা। আর এজন্য মহানবী (সা.) নির্দেশিত আমল হলো ইস্তিখারার নামাজ পড়া। ইস্তিখারা অর্থ হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ ও সঠিক পথটি প্রার্থনা করা।

আরও পড়ুন
যখন তুমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর নির্ভর করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর নির্ভরকারীদের ভালোবাসেন।
সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯

ইস্তিখারা করার সঠিক নিয়ম হলো,

  • সুন্দরভাবে অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা।

  • নামাজের সালাম ফেরানোর পর দরুদে ইব্রাহিম পাঠ করা।

  • আল্লাহর জিকির ও প্রশংসা করা (যেমন: ‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণ করা)।

  • হাদিসে বর্ণিত ইস্তিখারার বিশেষ দোয়া পাঠ করা। দোয়ার ভেতরে ‘হাজাল আমর’ (এই বিষয়টি) পাঠ করার সময় যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, তা মনে মনে সুনির্দিষ্টভাবে চিন্তা করা।

  • সর্বশেষে পুনরায় দরুদে ইব্রাহিম পাঠের মাধ্যমে ইস্তিখারা সম্পন্ন করা।

৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর দৃঢ় থাকা

সবশেষে যখন মনের ভেতর স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে, তখন দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে নির্দিষ্ট একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ফলাফলের জন্য পুরোপুরি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা বা ‘তাওয়াক্কুল’ করা।

বিশ্বাস রাখতে হবে যে মহান আল্লাহ যা আমাদের জন্য চয়ন করবেন, তা-ই আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য চূড়ান্ত কল্যাণকর। কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “...অতঃপর যখন তুমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর নির্ভর করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর নির্ভরকারীদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

ইসলামের এই চার ধাপ অনুসরণ করলে আল্লাহর ইচ্ছায় সিদ্ধান্তের পেছনের সমস্ত ভয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে দূর হয়ে যাবে। মন ভরে উঠবে এক অদ্ভুত আত্মিক প্রশান্তিতে।

আরও পড়ুন