দান কেন পৃথিবীর এক শাশ্বত নিয়ম
মানুষ হিসেবে আমরা যখন অন্যের জন্য ত্যাগের হাত বাড়িয়ে দিই, তখন কি আমরা স্রেফ একটি মানবিক কাজ করি, নাকি পৃথিবীর কোনো গূঢ় নিয়ম পালন করি?
‘দান’ কেবল আমরা স্কুলে বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিখি না, এটি আমাদের জন্মের সঙ্গে মিশে থাকা সহজাত প্রবৃত্তি। ইসলামের ‘ফিতরাত’ থেকে শুরু করে বৌদ্ধধর্মের ‘কার্মা’ পর্যন্ত—পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্ম ও দর্শন একবাক্যে স্বীকার করে যে, ‘দান’ বা ‘বদান্যতা’ হলো এই পৃথিবীর এক অলিখিত নিয়ম।
সহজাত স্বভাবের ডাক
ইসলামি দর্শনে দানশীলতাকে মানুষের ‘ফিতরাত’ বা জন্মগত স্বভাব হিসেবে দেখা হয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার ভেতরে দয়া ও অন্যের কল্যাণের প্রতি এক স্বাভাবিক আকর্ষণ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর দেওয়া ফিতরাত (সহজাত স্বভাব), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” (সুরা রুম, আয়াত: ৩০)।
একজন মুসলিম যখন সদকা করেন, তিনি কেবল তাঁর ধর্মীয় বিধান পালন করেন না, বরং তাঁর অন্তরের গহিনে থাকা সেই ‘ঐশী টান’ বা ফিতরাতকেই সাড়া দেন। ইসলামে দানকে কেবল অর্থ ব্যয় হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে দেখা হয় আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে।
আল্লাহ বলেন, “তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন।” (সুরা তাওবা, আয়াত: ১০৩)
হৃদয়ে খোদাই করা প্রাকৃতিক আইন
খ্রিষ্টধর্মে ‘ন্যাচারাল ল’ বা প্রাকৃতিক আইনের একটি ধারণা আছে, যা ইসলামের ফিতরাত ধারণার সঙ্গে মেলে। সেন্ট পল তাঁর রোমানদের প্রতি পত্রে উল্লেখ করেছেন, যারা কোনো ঐশী কিতাব পায়নি, তারাও অনেক সময় ভালো কাজ করে। কারণ, “ঈশ্বরের বিধান তাদের হৃদয়েই লেখা রয়েছে এবং তাদের বিবেকই তার সাক্ষী।” (নিউ টেস্টামেন্ট, রোমানস ২:১৫)
খ্রিষ্টধর্মে দানকে বলা হয় ‘কারিতাস’। তাদের বিশ্বাস মতে, বিবেক হলো মানুষের ভেতরে ‘ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’। যখন কোনো খ্রিষ্টান অভাবীকে সাহায্য করেন, তিনি মূলত তাঁর হৃদয়ে খোদাই করা সেই প্রাকৃতিক আইনেরই অনুগামী হন। এখানে নাম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কাজের উৎস সেই একই মানবীয় বোধ।
প্রাচ্যের দর্শন: ডার্মা ও কার্মার ভারসাম্য
সুদূর প্রাচ্যের হিন্দু ও বৌদ্ধ দর্শনেও দানের ধারণাটি অত্যন্ত গভীর এবং মহাজাগতিক। তাদের মূল বিশ্বাস হলো ‘ডার্মা’ (Dharma), যার অর্থ ‘মহাজাগতিক শৃঙ্খলা’ বা শাশ্বত নিয়ম।
তারা বিশ্বাস করে, গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণন থেকে শুরু করে গাছের বেড়ে ওঠা—সবই এক আদান-প্রদানের নিয়মে চলে। মানুষ যখন দান করে, যাকে তারা ‘দানা’ (Dāna) বলে, তখন সে মূলত বিশ্বের এই শাশ্বত ছন্দের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেয়।
এখানেই আসে ‘কার্মা’ (Karma) বা কর্মফলের ধারণা। কার্মা কেবল পুরস্কার বা শাস্তি নয়, এটি হলো নৈতিক কার্যকারণ বিধি। আপনি যখন কাউকে কিছু দিচ্ছেন, তখন আপনি আসলে মহাবিশ্বে একটি ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন, যা নিয়ম অনুযায়ী আপনার কাছেই ফিরে আসবে।
তাদের মতে, দান কোনো দয়া নয়, বরং এটি অস্তিত্বের একটি ধরণ। দানশীল মানুষই প্রকৃত অর্থে 'জীবন্ত', আর যে কেবল নিজের জন্য সঞ্চয় করে, সে মহাবিশ্বের প্রাণপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন এক মৃতপ্রায় সত্তা।
স্বার্থপরতা কি তবে অস্বাভাবিক
বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের এই তুলনামূলক চিত্র আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়:
মুসলিম একে বলেন ‘ফিতরাত’: আল্লাহর দেওয়া স্বভাব।
খ্রিষ্টান একে বলেন ‘প্রাকৃতিক আইন’: হৃদয়ে লেখা বিধি।
বৌদ্ধ বা হিন্দুরা একে বলেন ‘ডার্মা’: মহাজাগতিক শৃঙ্খলা।
পরিভাষা ভিন্ন হলেও সবার উপসংহার এক—মানুষ মূলত দেওয়ার জন্যই সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান পৃথিবীতে আমরা যে চরম স্বার্থপরতা বা আত্মকেন্দ্রিকতা দেখি, তা আসলে মানুষের মূল স্বভাব নয়, বরং এক ধরনের বিচ্যুতি। দান বা পরোপকার কোনো কষ্টকর ত্যাগ নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার একমাত্র পথ।
পৃথিবীর এই অদৃশ্য নিয়মটি কি কেবল আধ্যাত্মিক বা তাত্ত্বিক? আধুনিক বিজ্ঞান কি এর কোনো প্রমাণ পায়?
মজার বিষয় হলো, বর্তমানে স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সও প্রমাণ করছে যে, মানুষ যখন অন্যকে সাহায্য করে, তখন তার মস্তিষ্কে এমন কিছু হরমোন (যেমন ডোপামিন বা অক্সিটোসিন) নিঃসৃত হয়, যা তাকে প্রশান্তি দেয়।
অর্থাৎ, আমাদের শরীর ও মন এমনভাবেই তৈরি যে, অন্যের জন্য কিছু করার মধ্যেই আমাদের প্রকৃত সুখ নিহিত। আগামীতে হয়তো দেখা যাবে, ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরাও সেই সত্যটিই খুঁজে পাচ্ছেন, যা শত শত বছর আগে ঐশী বাণী বা প্রাচীন দর্শনগুলো বলে গেছে।