সাওদা বিনতে জামআ: ত্যাগ ও প্রজ্ঞার দৃষ্টান্ত

ছবি: পেক্সেলস

সাওদা বিনতে জামআ (রা.) ছিলেন আল্লাহর রাসুলের একজন সম্মানিত স্ত্রী। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিনি শুধু নবীজির ঘরের সদস্যই ছিলেন না, বরং তাঁর জীবন, চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে মুসলিম নারীদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ স্থাপন করেছিলেন।

তাঁর জীবনে যেমন ছিল দুঃখ ও সংগ্রাম, তেমনি ছিল হাসি, কৌতুক, আত্মত্যাগ ও গভীর বুদ্ধিমত্তার দীপ্ত প্রকাশ।

হজরত সাওদা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে। তাঁর পিতার নাম জামআ ইবনে কায়স এবং মায়ের নাম শাম্মুস বিনতে কায়স। কোরাইশ বংশীয় একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর দুই ভাই ছিলেন—মালেক ইবনে জামআ ও আবদ ইবনে জামআ।

মালেক (রা.) ইসলামের প্রথম যুগেই ইমান আনয়ন করেন এবং আবিসিনিয়ায় দ্বিতীয় হিজরতে অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে আবদ ইবনে জামআ প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ না করলেও পরে মুসলমান হন এবং নিজের পূর্ববর্তী আচরণের জন্য অনুতপ্ত হন।

সাওদা (রা.) আনন্দের সঙ্গে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং পিতার সম্মতিও এতে যুক্ত হয়। নবুয়তের দশম বছরে, রমজান মাসে, রাসুলের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়।

নবীজির সঙ্গে বিবাহের পূর্বে সাওদা বিবাহিত ছিলেন তাঁর চাচাতো ভাই সাকরান ইবনে আমর (রা.)–এর সঙ্গে। স্বামীর সঙ্গে তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। হিজরত থেকে ফিরে মক্কায় আসার পর স্বামী ইন্তেকাল করলে তিনি গভীর শোক ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে পড়েন। স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত পালন শেষে তাঁর জীবন এক নতুন মোড় নেয়।

খাদিজার ইন্তেকালের পর নবীজি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। সেই সময় খাওলা বিনতে হাকিম (রা.) নবীজির কাছে এসে পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি নবীজিকে কুমারী ও বিধবা—উভয় ধরনের পাত্রী সম্পর্কে অবহিত করেন। কুমারী হিসেবে আয়েশা (রা.) এবং বিধবা হিসেবে সাওদা রা.-এর নাম উল্লেখ করেন।

নবীজি উভয়ের কাছেই প্রস্তাব পাঠান। সাওদা (রা.) আনন্দের সঙ্গে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং পিতার সম্মতিও এতে যুক্ত হয়। নবুয়তের দশম বছরে, রমজান মাসে, রাসুলের সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়। (বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৪/৩১৬)

আরও পড়ুন

এই বিবাহ ছিল সাওদার জীবনে এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। স্বামীর জীবদ্দশাতেই তিনি এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন, যার ব্যাখ্যায় তাঁর স্বামী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন—তিনি শিগগিরই ইন্তেকাল করবেন এবং পরবর্তী সময়ে সাওদা (রা.) নবীজির স্ত্রী হবেন। পরে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়, যা তাঁর জীবনের এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। (কিতাবুর রুইয়া, পৃ. ১৫০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বিয়ে করেছিলেন বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তাঁর চরিত্র, ধৈর্য, ইমান ও শোকাহত অবস্থায় সান্ত্বনার প্রয়োজন বিবেচনা করেই। সাওদা (রা.) ছিলেন বয়সে পরিণত, বিধবা ও সন্তানসহ একজন নারী। তবু নবীজি তাঁকে সম্মান ও ভালোবাসার সঙ্গে গ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে বিবাহের পর তিন বছর পর্যন্ত নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। এই সময় তিনি একাই নবীজির ঘর সামলান, যা তাঁর দায়িত্ববোধ ও যোগ্যতার প্রমাণ।

সাওদা ছিলেন অত্যন্ত আনুগত্যশীলা স্ত্রী। রাসুলের সন্তুষ্টিকে তিনি নিজের ইচ্ছা ও স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। নবীজি আয়েশাকে বেশি ভালোবাসেন—এটি তিনি উপলব্ধি করতেন এবং সেই ভালোবাসাকে সম্মান জানিয়ে নিজের নির্ধারিত পালা স্বেচ্ছায় আয়েশা রা.-কে দিয়ে দেন।

তিনি ছিলেন স্বভাবজাতভাবে প্রফুল্ল ও রসিক। নবীজিকে হাসাতে তিনি নানা মজার কথা বলতেন। তাঁর এই গুণের কারণে রাসুলের অন্য স্ত্রীরাও তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।

এতে তাঁর আত্মত্যাগ, প্রজ্ঞা ও পরিণত মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি চেয়েছিলেন, দুনিয়াতে নবীজির স্ত্রী হিসেবেই থাকবেন এবং আখিরাতেও তাঁর সান্নিধ্য লাভ করবেন।

নবীজির প্রতি তাঁর আনুগত্য এতটাই গভীর ছিল যে রাসুলের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলেন। নবীজি জীবনের শেষ দিকে স্ত্রীদের ঘরের বাইরে কম বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ পালনে সাওদা (রা.) রাসুলের ওফাতের পর আর হজ বা ওমরাহ পালন করেননি। এটি তাঁর আনুগত্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৩৮, ২৭২২)

তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি উজ্জ্বল দিক ছিল হাস্যরস ও কৌতুকপ্রিয়তা। তিনি ছিলেন স্বভাবজাতভাবে প্রফুল্ল ও রসিক। নবীজিকে হাসাতে তিনি নানা মজার কথা বলতেন। তাঁর এই গুণের কারণে রাসুলের অন্য স্ত্রীরাও তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।

একাধিক ঘটনার মাধ্যমে দেখা যায়—ঘরোয়া পরিবেশে তাঁর কৌতুকপূর্ণ আচরণ নবীজির মুখে হাসি ফুটিয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে তিনি সংসারে আনন্দ ও প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে দিতেন।

আরও পড়ুন

দানশীলতা ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি উদার হস্তে দান করতেন এবং সম্পদ জমিয়ে রাখতেন না। নবীজির এক বাণীতে ‘লম্বা হাত’-এর ব্যাখ্যা বাস্তবে প্রমাণিত হয় তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে। দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। এই দানশীলতা তাঁকে আল্লাহ ও মানুষের কাছে সম্মানিত করে তোলে। (তাখরিজু সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩,৩১৫)

পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পেছনেও তাঁর জীবনের একটি ঘটনা ভূমিকা রাখে। এক রাতে প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে গেলে তাঁকে চিনে ফেলেন উমর (রা.)। এই ঘটনার পর সুরা আহযাবের পর্দাসংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়। এভাবে তাঁর জীবন ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রণয়নের উপলক্ষ হয়। (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৯, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২,১৭০)

তাঁর মৃত্যুকে সাহাবিগণ বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সিজদা করেন—কারণ, নবীজির স্ত্রীদের মৃত্যু উম্মতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার ক্ষেত্রেও সাওদা (রা.) ছিলেন অনন্য। বয়স বৃদ্ধির কারণে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন—নবীজি হয়তো তাঁকে তালাক দিতে পারেন। তবে তিনি আগেভাগেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন এবং তালাক না দেওয়ার অনুরোধ জানান।

ইতিহাসে প্রচলিত কিছু দুর্বল বর্ণনায় তালাকের কথা থাকলেও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নবীজি তাঁকে তালাক দেননি। বরং তাঁর এই আত্মসমর্পণ ও প্রজ্ঞা নবীজির কাছে তাঁর মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২,১৩৫)

হজরত সাওদা (রা.)–এর ইন্তেকাল সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি ৫৪ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুকে সাহাবায়ে কেরাম বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সিজদা করেন—কারণ, নবীজির স্ত্রীদের মৃত্যু উম্মতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

সার্বিকভাবে হজরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.) ছিলেন ধৈর্য, ত্যাগ, হাস্যরস, দানশীলতা ও প্রজ্ঞার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবন থেকে মুসলিম নারীরা শিখতে পারেন—কীভাবে স্বামীর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে হয়, কীভাবে সংসারে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে হয় এবং কীভাবে নিজের স্বার্থের চেয়ে ধর্মীয় কল্যাণকে বড় করে দেখতে হয়।

তাঁর জীবন ইতিহাসের পাতায় এক নীরব কিন্তু দীপ্ত অধ্যায় হয়ে আজও আমাদের প্রেরণা জোগায়।

আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক

আরও পড়ুন