নফসের বিরুদ্ধে লড়াই: নিজের প্রবৃত্তিকে জয় করার ১০ কার্যকর কৌশল

ছবি: পেক্সেলস

অনেকেরই মনে এই আক্ষেপ জাগে যে, "আমি তো চাই ভালো পথে চলতে, কিন্তু আমার নফস আমাকে বারবার ভুল পথে টেনে নেয়। আমি নফসের সঙ্গে লড়াই করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নই।"

এই অনুভূতিটি অস্বাভাবিক কিছু নয়; বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এটিই প্রথম ধাপ।

নফস বা নিজের কুপ্রবৃত্তির সঙ্গে যুদ্ধ করাকে ইসলামে 'জিহাদুন নফস' বলা হয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) এই সংগ্রামকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ এই নয় যে সব ইচ্ছা বিসর্জন দিতে হবে, বরং এর অর্থ হলো নিজের লাগামহীন ইচ্ছাকে আল্লাহর হুকুমের অধীনে নিয়ে আসা।

নফসের স্বরূপ চেনা

পবিত্র কোরআনে নফসের তিনটি স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:

১. নফসে আম্মারা: যা মানুষকে মন্দের দিকে ধাবিত করে (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩)

২. নফসে লাওয়ামা: যা মন্দ কাজ করলে মানুষকে অনুতপ্ত করে বা তিরস্কার করে (সুরা কিয়ামাহ, আয়াত: ২)। ৩.

নফসে মুতমাইন্নাহ: প্রশান্ত আত্মা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টিতে তৃপ্ত থাকে (সুরা ফাজর, আয়াত: ২৭)।

নফসের সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে একটি পরিকল্পিত পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন। নিচে সে লক্ষ্যে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ আলোচনা করা হলো:

আরও পড়ুন

নফসকে জয় করার ১০টি ধাপ

১. একটি তালিকা তৈরি করুন

আপনার নফস আপনাকে ঠিক কোন কোন কাজে সবচেয়ে বেশি প্ররোচিত করে, তার একটি তালিকা তৈরি করুন। হতে পারে তা অলসতা, পরনিন্দা, রাগ, কিংবা হারাম কোনো আসক্তি।

তালিকাটি করার পর সেগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী সাজান—সবচেয়ে ছোট সমস্যা থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা।

২. ছোট ছোট বিজয় দিয়ে শুরু করুন

তালিকার সবচেয়ে নিচের দিকে থাকা ২-৩টি ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের দিকে প্রথমে মনোযোগ দিন। কারণ, ছোট ছোট যুদ্ধে জয়ী হলে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং আপনি বড় বড় প্রলোভনের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি পাবেন।

৩. লক্ষ্য নির্ধারণ ও পরিকল্পনা

যে ৪-৫টি বড় অভ্যাস নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন, সেগুলো আলাদা করুন। প্রতিটি অভ্যাসের জন্য একটি করে 'অ্যাকশন প্ল্যান' তৈরি করুন।

যেমন: যদি সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি আপনার সমস্যা হয়, তবে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ফোন দূরে রাখার নিয়ম করুন।

৪. পরিবেশ পরিবর্তন

মানুষ তার পরিবেশ দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। নফসের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে হলে যেসব জায়গা বা বন্ধু আপনাকে খারাপ কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, "মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (জীবনধারা) দ্বারা প্রভাবিত হয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩)

৫. নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার

নফসের কাছে হেরে গিয়ে কোনো ভুল করে ফেললে হতাশ হওয়া চলবে না। আল্লাহ তাআলা তওবাকারীকে ভালোবাসেন। তিনি বলেন, "হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।" (সুরা আজ-জুমার, আয়াত: ৫৩)

ভুল হওয়া মাত্রই ফিরে আসা হলো নফসের মুখে চপেটাঘাত।

আরও পড়ুন

৬. রোজা রাখা

নফসকে দুর্বল করার অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হলো রোজা। রোজা কেবল পেটকেই নয়, বরং মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। রাসুল (সা.) যুবকদের নফস নিয়ন্ত্রণের জন্য রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৫)

৭. সৎসঙ্গের সাহচর্য

এমন মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান যারা আপনাকে আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়। ভালো মানুষের সান্নিধ্য আপনার ভেতরের 'নফসে লাওয়ামা' বা অনুতপ্ত আত্মাকে জাগ্রত রাখবে।

৮. নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির

জিকির হলো অন্তরের প্রশান্তি। যখনই নফস কোনো খারাপ কাজের দিকে ডাকবে, তখনই 'আউযুবিল্লাহ' পড়ে আল্লাহর জিকিরে মশগুল হন। এটি শয়তানি প্ররোচনা থেকে সুরক্ষা দেয়।

৯. মৃত্যুর স্মরণ

নফসকে বশ করার একটি কার্যকর উপায় হলো এটি মনে রাখা যে, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। মৃত্যুর পরের জীবনের কথা চিন্তা করলে দুনিয়াবি প্রলোভনগুলো তুচ্ছ মনে হতে শুরু করে।

১০. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা

নফসকে জয় করার সামর্থ্য একমাত্র আল্লাহ দিতে পারেন। প্রতিদিন মোনাজাতে আল্লাহর কাছে শক্তি চান। বলুন, "হে আল্লাহ! আপনি আমার নফসকে তাকওয়া দান করুন এবং একে পবিত্র করুন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২)।

নফস কী চিরতরে দমে যায়

মনে রাখবেন, নফসের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একদিনের বিষয় নয়, এটি জীবনব্যাপী এক প্রক্রিয়া। কোনোদিন আপনি জয়ী হবেন, কোনোদিন হয়তো নফস আপনাকে হারিয়ে দেবে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো হাল না ছাড়া। প্রতিটি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই হলো প্রকৃত বীরত্ব।

আরও পড়ুন