জীবনের প্রকৃত সফলতা কী

ছবি: পেক্সেলস

মানুষের জীবনের প্রকৃত সফলতা কী—এই প্রশ্নটি যত পুরোনো, ততই গভীর। কেউ মনে করে ধন-সম্পদ, কেউ খ্যাতি, কেউ ক্ষমতা—এসবই সফলতার মাপকাঠি। কিন্তু বাস্তবে মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করে তার অন্তরের পরিশুদ্ধতা, তার চরিত্রের উন্নয়ন এবং তার লক্ষ্য কতটা সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে তার ওপর।

ইসলামের ভাষায় এই অন্তরের পরিশুদ্ধতাকেই বলা হয় ‘তাজকিয়া’। এই তাযকিয়া ছাড়া মানুষ বাহ্যিকভাবে যতই সফল দেখাক না কেন, প্রকৃত সফলতার দরজায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।

কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পেরেছে, সেই-ই সফলকাম।” (সুরা শামস, আয়াত: ৯)

যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পেরেছে, সেই-ই সফলকাম।
সুরা শামস, আয়াত: ৯

এখানে পরিশুদ্ধতা বলতে শুধু পাপ থেকে দূরে থাকা বোঝায় না; বরং নিজের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, ইচ্ছা—সবকিছুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত করাই প্রকৃত পরিশুদ্ধতা।

অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিত্ব কেবল তার বাহ্যিক রূপ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা যায় না; তার অন্তরের অবস্থা, তার নৈতিকতা, তার আচরণ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে তার প্রকৃত পরিচয়।

মানুষের জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তার ভেতরে যেমন ভালো আছে, তেমনি মন্দও আছে। এই ভালো-মন্দের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই তাকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয়। আর একজন প্রকৃত মুমিনের জন্য সেই লক্ষ্য একটি—আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভ করা।

কারণ, দুনিয়ার সবকিছু ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু পারকালের জীবন চিরস্থায়ী। কোরআনে বারবার বলা হয়েছে, আখেরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন। (সুরা আসকাবুত, আয়াত: ৬৪)

আরও পড়ুন

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ—এই দুটি বিষয় আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

কেউ যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে পারে, তাহলে জান্নাত তার জন্য নিশ্চিত। আবার জান্নাত লাভের একমাত্র পথও হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে।

কোরআনে এমন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সবকিছু উৎসর্গ করে দেয়। তারা তাদের জীবন, সম্পদ—সব আল্লাহর পথে ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকে।

আল্লাহ–তাআলা এই ধরনের বান্দাদের সঙ্গে যেন এক ধরনের ‘লেনদেন’ করেছেন—তাদের জীবন ও সম্পদের বিনিময়ে তিনি তাদের জন্য জান্নাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি একজন মুমিনকে দুনিয়ার প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত করে এবং তাকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে পরিচালিত করে।

দুনিয়ার জীবন বাহ্যিকভাবে যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী, প্রতারণাময়।

অন্যদিকে, যারা এই সত্যকে উপেক্ষা করে কেবল দুনিয়ার জীবনকে তাদের সবকিছু মনে করে, তারা প্রকৃতপক্ষে একটি বড় বিভ্রান্তির মধ্যে থাকে। দুনিয়ার জীবন বাহ্যিকভাবে যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, তা আসলে ক্ষণস্থায়ী, প্রতারণাময়।

মানুষ এই দুনিয়ায় যা যা অর্জন করে—ধন, সম্পদ, সম্মান—মৃত্যুর পর সেগুলোর কোনো মূল্য থাকে না। তখন শুধু তার আমলই তার সঙ্গে থাকবে।

আখেরাতের বাস্তবতা খুবই কঠিন। সেখানে হয় আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি থাকবে, নয়তো ভয়াবহ শাস্তি। জাহান্নামের শাস্তির কথা কোরআনে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। কেউ যদি এই শাস্তির কথা সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তাহলে সে কখনোই নিজের ইচ্ছায় সেই পথে হাঁটতে চাইবে না।

কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ দুনিয়ার মোহে পড়ে এই সত্যকে ভুলে যায়। এই কারণেই কোরআন মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছে, দুনিয়ার জীবন আসলে একটি ধোঁকার সামগ্রী। (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)

এটি মানুষকে এমনভাবে আকৃষ্ট করে, যেন এটিই সবকিছু। অথচ বাস্তবে এটি একটি ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা মাত্র। যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে, তারাই প্রকৃত সফল।

আরও পড়ুন

দুনিয়ার পেছনে অন্ধভাবে ছুটে চলা অনেকটা মরীচিকার পেছনে দৌড়ানোর মতো। দূর থেকে মনে হয় সেখানে পানি আছে, কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায়। ঠিক তেমনি, দুনিয়ার সফলতা মানুষকে সাময়িক আনন্দ দিলেও তা স্থায়ী শান্তি বা প্রকৃত সফলতা দিতে পারে না। বরং এটি মানুষকে তার আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে।

তাই একজন সচেতন মানুষের উচিত তার জীবনের মূল লক্ষ্যকে সবসময় সামনে রাখা। তার প্রতিটি কাজ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন তাকে সেই লক্ষ্য—আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। 

কোরআনে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে, তারা যেন আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। এই প্রতিযোগিতা দুনিয়ার প্রতিযোগিতার মতো নয়; এটি একটি পবিত্র প্রতিযোগিতা, যেখানে লক্ষ্য হলো নৈতিক উন্নতি, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।

এই পৃথিবীতে মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, তার উচিত মাঝে মাঝে থেমে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করা। সে কোথায় যাচ্ছে, তার লক্ষ্য কী, সে কী অর্জন করতে চায়

এই পৃথিবীতে মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, তার উচিত মাঝে মাঝে থেমে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা করা। সে কোথায় যাচ্ছে, তার লক্ষ্য কী, সে কী অর্জন করতে চায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা।

কারণ, যে ব্যক্তি তার লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট নয়, সে কখনোই সঠিক পথে এগোতে পারে না।

সবশেষে, কোরআন একটি চূড়ান্ত সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে, কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষ তার পূর্ণ প্রতিদান পাবে। তখন যার আমল তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবে, সেই-ই হবে প্রকৃত সফলকাম। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

এই সফলতা দুনিয়ার কোনো সফলতার সঙ্গে তুলনীয় নয়; এটি চিরস্থায়ী, পরিপূর্ণ এবং পরম শান্তির উৎস।

মানুষের জীবনের প্রকৃত সফলতা দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী অর্জনে নয়; বরং তার অন্তরের পরিশুদ্ধতা, তার নৈতিক উন্নয়ন এবং তার লক্ষ্য সঠিকভাবে নির্ধারণের মধ্যেই নিহিত। যে ব্যক্তি এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে এবং তার জীবনকে সেই অনুযায়ী গড়ে তোলে, সে-ই দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে।

আরও পড়ুন