আমরা এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে ভোগবাদ আর বৈষয়িক সাফল্যই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পবিত্র কোরআন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, এই জগত কেবলই এক সাময়িক পান্থশালা।
দুনিয়ার মোহে অন্ধ হয়ে চিরস্থায়ী আখিরাতকে ভুলে যাওয়া প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দুনিয়ার আসক্তি কমিয়ে মনকে প্রশান্ত করতে কোরআনের ১০টি দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:
১. প্রকৃত জীবনের সন্ধান
দুনিয়ার চাকচিক্য মূলত একটি ক্ষণস্থায়ী বিনোদন মাত্র। যারা এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তারা কখনোই এর মোহে দিশেহারা হয় না।
উচ্চারণ: ওয়ামা হাযিহিল হায়াতুদ দুনইয়া ইল্লা লাহওয়ুও ওয়া লা'ইব, ওয়া ইন্নাদ দারাল আখিরাতা লাহিয়াল হায়াওয়ান।
অর্থ: আর এই দুনিয়ার জীবন খেলা ও বিনোদন ছাড়া কিছুই নয়। আর নিশ্চয়ই আখিরাতের ঘরই প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৬৪)
২. স্থায়ী আবাসের প্রস্তুতি
দুনিয়াতে আমরা যা কিছু ভোগ করি তা অত্যন্ত সামান্য। প্রকৃত স্থায়ী ঠিকানা হলো পরকাল।
উচ্চারণ: ইন্নামা হাযিহিল হায়াতুদ দুনইয়া মাতা'উও ওয়া ইন্নাল আখিরাতা হিয়া দারুল কারার।
অর্থ: হে আমার জাতি! এই দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণস্থায়ী ভোগ মাত্র, আর আখিরাত হচ্ছে স্থায়ী আবাস। (সুরা গাফির, আয়াত: ৩৯)
৩. সম্পদ ও সন্তান কেবল সৌন্দর্য
সম্পদ ও সামাজিক প্রতিপত্তি কেবল জীবনের সাময়িক সাজসজ্জা। মানুষের আসল পরিচয় ও পাথেয় হলো তার সৎকর্ম বা নেক আমল।
উচ্চারণ: আলমালু ওয়াল বানুনা যিনাতুল হায়াতিদ দুনইয়া, ওয়াল বাকিয়াতুস সালিহাতু খাইরুন ইনদা রাব্বিকা।
অর্থ: সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য। আর স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তোমার রবের নিকট প্রতিদান ও আশার দিক থেকে উত্তম। (সুরা কাহফ, আয়াত: ৪৬)
৪. ধোঁকার সামগ্রী থেকে সাবধান
অধিক সম্পদ আর ক্ষমতার প্রতিযোগিতা মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। একেই কোরআন ‘ধোঁকার সামগ্রী’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
উচ্চারণ: ওয়া মাল হায়াতুদ দুনইয়া ইল্লা মাতাউল গুরুর।
অর্থ: আর দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২০)
৫. অল্পে তুষ্ট থাকার দর্শন
আখিরাতের অসীম নেয়ামতের তুলনায় দুনিয়ার ভোগ-বিলাস অত্যন্ত নগণ্য। এই ক্ষুদ্র প্রাপ্তিতেই চরম তৃপ্ত হওয়া মুমিনের কাজ নয়।
উচ্চারণ: আরাদিতুম বিলহায়াতিদ দুনইয়া মিনাল আখিরাহ, ফামা মাতাউল হায়াতিদ দুনইয়া ফিল আখিরাতি ইল্লা কালিল।
অর্থ: তোমরা কি আখেরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে সন্তুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের ভোগ সামান্যই। (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৮)
৬. ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের উপমা
দুনিয়ার রূপ-লাবণ্য ঠিক বৃষ্টির পর সবুজ হয়ে ওঠা মাঠের মতো, যা সোনালি ফসল দেওয়ার পর একসময় শুকিয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
উচ্চারণ: ইন্নামা মাছালুল হায়াতিদ দুনইয়া কামাইন আনযালনাহু মিনাস সামায়ি... ফাজা'আলনাহা হাসিদা।
অর্থ: দুনিয়ার জীবনের দৃষ্টান্ত পানির মতো যা আকাশ থেকে বর্ষণ করি... অতঃপর আমি তাকে এমনভাবে কেটে ফেলি যেন কাল তা ছিলই না। (সুরা ইউনুস, আয়াত: ২৪)
৭. বোধোদয় ও আধ্যাত্মিকতা
দুনিয়ার চাকচিক্যময় জীবনের চেয়ে পরকালের শান্তিময় ঘর অনেক বেশি নিরাপদ ও সম্মানজনক।
উচ্চারণ: ওয়া লাদদারুল আখিরাতু খাইরুল লিল্লাযিনা ইয়াত্তাকুন, আফালা তা'কিলুন।
অর্থ: আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের ঘরই উত্তম। তোমরা কি বুঝবে না? (সুরা আনআম, আয়াত: ৩২)
৮. পরিণাম সম্পর্কে সতর্কতা
যারা পরকালকে তুচ্ছ করে কেবল দুনিয়ার পেছনে উন্মত্ত থাকে, তাদের জন্য জাগতিক সাময়িক ভোগের পর অপেক্ষা করছে চরম শূন্যতা।
উচ্চারণ: মাতাউন কালিলুন ছুম্মা মা'ওয়াহুম জাহান্নাম।
অর্থ: সামান্য ভোগ, তারপর তাদের আবাস জাহান্নাম, আর তা কতই না নিকৃষ্ট স্থান। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৭)
৯. আমলের অগ্রাধিকার
মানুষ যা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, আল্লাহ তাকে তাই দেন। যে কেবল দুনিয়া চায়, সে আখিরাতে রিক্তহস্ত থেকে যায়।
উচ্চারণ: মান কানা ইউরিদু হারছাল আখিরাতি নাযিদ লাহু ফি হারছিহি।
অর্থ: যে আখিরাতের ফসল চায়, আমি তার জন্য তার ফসলে বৃদ্ধি করে দেই। (সুরা শুরা, আয়াত: ২০)
১০. ভারসাম্যপূর্ণ জীবন
ইসলাম দুনিয়াকে পুরোপুরি ত্যাগের কথা বলে না, বরং দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতেই কল্যাণ প্রার্থনার শিক্ষা দেয়।
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২০০-২০১)
পরিশেষে, দুনিয়ার আসক্তি মুক্ত হওয়ার অর্থ জীবনকে অবহেলা করা নয়, বরং জীবনকে স্রষ্টার ইবাদত ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত করে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করা। আল্লাহ আমাদের সেই সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।
সাধারণ পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে বাংলা উচ্চারণ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ উচ্চারণের জন্য মূল আরবি আয়াতের সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়।