নবীজি যেভাবে হাসতেন

ছবি: পেক্সেলস

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তিনিই হাসান এবং তিনিই কাঁদান; আর তিনিই মৃত্যু দান করেন এবং তিনিই জীবন দেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৪৩-৪৪)

নবীজির পবিত্র জীবনেও ছিল আনন্দ-বেদনা, হাসি ও কান্নার মানবিক অনুভূতি; তবে তাঁর সেই হাসি ছিল সংযম, গাম্ভীর্য ও মার্জিত রূপের এক অনুপম বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার মুচকি হাসি দেওয়াও একটি সদকা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

ইসলামে হাসির তিন স্তর

ইসলামি আইনশাস্ত্র ও ভাষার বিশ্লেষণে মানুষের হাসিকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে:

১. মুচকি হাসি: এটি হাসির সর্বোত্তম স্তর। এতে কোনো শব্দ বা আওয়াজ হয় না; কেবল মুখমণ্ডলে মৃদু প্রসন্নতা ও ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। নবীজির অধিকাংশ হাসিই ছিল তাবাসসুম বা মুচকি হাসি। এটি উম্মতের জন্য অন্যতম প্রিয় সুন্নাত।

‘আমি নবীজি কখনো এমনভাবে মুখ খুলে অট্টহাসি দিতে দেখিনি, যাতে তাঁর আলজিভ দেখা যায়; বরং তিনি সর্বদা মৃদু মুচকি হাসতেন।
আয়েশা (রা.), সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯২

২. সাধারণ হাসি: এ ধরনের হাসিতে মানুষের মুখ কিছুটা প্রসারিত হয় এবং দাঁত বা মাড়ির দাঁত প্রকাশিত হতে পারে, কিন্তু দূর থেকে শোনা যায় এমন কোনো বিকট শব্দ হয় না। বিশেষ আনন্দঘন বা চমকপ্রদ পরিস্থিতিতে নবীজি (সা.) থেকে এমন হাসিও কদাচিৎ প্রকাশ পেয়েছে। এটি শরিয়তে সম্পূর্ণ জায়েজ।

৩. অট্টহাসি: বিকট শব্দ করে পেট কাঁপিয়ে হাসা, যাতে চেহারার স্বাভাবিক গাম্ভীর্য নষ্ট হয়। ইসলামে এভাবে অট্টহাসি দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; কারণ এটি অন্তরের আধ্যাত্মিক সজীবতা বিনষ্ট করে। হানাফি ফিকহের বিধান অনুযায়ী, রুকু-সিজদাবিশিষ্ট নামাজে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে অট্টহাসি দিলে তার নামাজ ও অজু উভয়টিই ভেঙে যায়। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, ১/২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

আরও পড়ুন

নবীজির হাসির ধরন

হাদিস শরিফে নবীজির প্রাত্যহিক হাসির ধরন নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি কখনোই মুখ ব্যাদান করে অট্টহাসি দিতেন না।

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি নবীজি কখনো এমনভাবে মুখ খুলে অট্টহাসি দিতে দেখিনি, যাতে তাঁর আলজিভ দেখা যায়; বরং তিনি সর্বদা মৃদু মুচকি হাসতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৯২)

কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)

নবীজি (সা.) কোনো রুক্ষ, কঠোর বা কৃত্রিম গাম্ভীর্যের মানুষ ছিলেন না; তিনি সবসময় সাহাবিদের মাঝে প্রফুল্ল বদনে উপস্থিত হতেন। সাহাবি জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে নবীজি কখনো আমাকে তাঁর দরবারে প্রবেশে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার দিকে তাকিয়েছেন, তখনই তাঁর পবিত্র মুখে মুচকি হাসি লেগে ছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৭৬)

তবে বিশেষ কোনো বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলে নবীজি (সা.) এমনভাবে হাসতেন যে তাঁর দাঁত প্রকাশিত হতো। এক সাহাবি ‘কাফফারা’ আদায়ে অপারগতা প্রকাশ করলে নবীজি তাঁকে এক ঝুড়ি খেজুর দেন দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য।

খেজুর পেয়ে সাহাবি বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার পরিবারের চেয়ে অভাবী কি এই মদিনার দুই প্রান্তের মাঝে কেউ আছে?’ তাঁর অকপট সারল্য দেখে নবীজি এমনভাবে হেসেছিলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত (নাওয়াজিজ) পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৩৬)

এক বৃদ্ধ নারী নবীজির কাছে এসে আবেদন করলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে বেহেশতবাসী করেন।’ নবীজি (সা.) স্বভাবসুলভ মৃদু হেসে বললেন, ‘কোনো বৃদ্ধা তো বেহেশতে যাবে না।’

নবীজির নির্মল কৌতুক

নবীজি (সা.) বিভিন্ন সময়ে সাহাবিদের সঙ্গে স্নেহমাখা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌতুক করতেন—যা পারস্পরিক ভালোবাসাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিত:

আবু তুরাব সম্বোধন: একবার আলী (রা.)-এর ওপর কিছুটা মান অভিমান হলে তিনি মসজিদে এসে মাটির ওপর শুয়ে পড়েন। এতে তাঁর পিঠের চাদর সরে গিয়ে শরীরে ধুলাবালি লেগে যায়। রাসুল (সা.) সেখানে উপস্থিত হয়ে পরম স্নেহে নিজ হাতে তাঁর পিঠের মাটি ঝেড়ে দিতে দিতে মুচকি হেসে বললেন, ‘ওঠো, হে মাটির পিতা (আবু তুরাব), ওঠো, হে আবু তুরাব!’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪১)

এই স্নেহমাখা সম্বোধন আলীর কাছে আজীবন সবচেয়ে প্রিয় উপাধি ছিল।

বিড়ালের ছানা: সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে সাখর (রা.) একটি ছোট বিড়ালছানাকে নিজের কাপড়ের আস্তিনে পরম যত্নে রাখতেন। নবীজি একদিন তা দেখে ভালোবেসে তাঁকে ‘ইয়া আবা হুরাইরাহ’ (হে বিড়ালের পিতা) বলে ডাকলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৪০)

নবীজির এই ভালোবাসাময় ডাকটিই ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হয়। তিনি খ্যাত হন আবু হোরাইরা নামে।

আরও পড়ুন

বৃদ্ধাদের জান্নাতে প্রবেশ: এক বৃদ্ধা নারী নবীজির কাছে এসে আবেদন করলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে বেহেশতবাসী করেন।’ নবীজি (সা.) স্বভাবসুলভ মৃদু হেসে বললেন, ‘কোনো বৃদ্ধা তো বেহেশতে যাবে না।’ বৃদ্ধা নারী এ কথা শুনে কাঁদতে শুরু করলেন। তখন নবীজি বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বেহেশতের যাওয়ার সময় কেউ আর বৃদ্ধ থাকবে না; বরং আল্লাহ সবাইকে তরুণ ও চিরসবুজ রূপ দান করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১)

হাস্যরসে ভারসাম্য

হাদিসের কোনো কোনো বর্ণনায় অতিরিক্ত হাসাহাসি নিষেধ করা হয়েছে। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অতিরিক্ত হেসো না; কেননা অতিরিক্ত হাসি অন্তরকে নির্জীব ও মৃত করে দেয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৯৩)

এই দুই ধরনের হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘যে কৌতুক সীমা ছাড়িয়ে যায়, মানুষের অন্তরে কাঠিন্য তৈরি করে, আল্লাহর জিকির থেকে গাফেল করে কিংবা অন্যের আত্মসম্মানে আঘাত হানে—ইসলামে সেই অসংযত হাস্যরসই নিষিদ্ধ। পক্ষান্তরে মানুষের মন প্রফুল্ল রাখা, ক্লান্ত হৃদয়কে স্বস্তি দেওয়া এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিমিত হাস্যরস করা কেবল জায়েজই নয়; বরং এটি একটি প্রশংসনীয় সুন্নাত।’ (ইমাম নববি, আল-আজকার আল-মুন্তাখাবাহ মিন কালামি সাইয়্যিদিল আবরার, পৃষ্ঠা: ৩২৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)

নিশ্চয়ই আমিও হাসি-আনন্দ করি; তবে আমি মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া অসত্য বা অনর্থক কোনো কথা বলি না।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯০

আবদুল্লাহ ইবনে ওমরকে একবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘নবীজির সাহাবিরা কি কখনো নিজেদের মাঝে হাসাহাসি ও কৌতুক করতেন?’ তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, তাঁরা অবশ্যই হাসতেন ও আনন্দ করতেন; কিন্তু তাঁদের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ইমান ছিল পর্বতসম সুদৃঢ় ও অটল।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৮১২২)

হাস্যরস ও কৌতুকের নবীজির সীমারেখা

ইসলাম আনন্দ ও নির্দোষ কৌতুককে নিষেধ করে না; কিন্তু কৌতুকের নামে মিথ্যা বলা, কারও দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করা কিংবা গীবত করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

একবার সাহাবিরা কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও কি আমাদের সঙ্গে কৌতুক ও পরিহাস করেন?’ তখন রাসুল (সা.) হাসির মূলনীতি জানিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আমিও হাসি-আনন্দ করি; তবে আমি মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া অসত্য বা অনর্থক কোনো কথা বলি না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৯০)

মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে বানোয়াট গল্প ফাঁদার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়ে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তির জন্য ধ্বংস অনিবার্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে; তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস!’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯০)

আরও পড়ুন