পিতার শেকলে বন্দী দুই মুসলিম ভাইয়ের লড়াই

ছবি: ফ্রিপিক

মক্কার কোরাইশ নেতা সোহাইল ইবনে আমরের ঘরটি আর সব ঘরের মতো সাধারণ সংসার ছিল না; ছিল নবুয়তের প্রথম যুগে পুরো মক্কার সামাজিক সংঘাতের এক খুদে প্রতিচ্ছবি।

সোহাইল ইবনে আমর ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ বক্তা, প্রজ্ঞাবান বিচারক ও সামাজিক ক্ষমতার প্রতাপশালী প্রতীক। তাঁর দুই তরুণ সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল ও আবু জান্দাল। দুই ভাই মুসলমান হলে ঘরে শুরু হলো মনস্তাত্ত্বিক ও ইমানি দ্বন্দ্ব।

একদিকে পিতা ও গোত্রের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য, অন্যদিকে হৃদয়ের গহীনে জেগে ওঠা আসমানি বিশ্বাসের পরম সত্য। পরবর্তী জীবনে আবদুল্লাহ বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে অংশ নেন, ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। আর আবু জান্দাল হন হোদাইবিয়ার ঐতিহাসিক চরিত্র।

যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ পুরো বদলে যান এবং চরম এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। যেন তিনি এই অপেক্ষাতেই ছিলেন এতদিন। তিনি পিতার বাহিনী ত্যাগ করে এক লহমায় মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল

বড় ভাই আবদুল্লাহ সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে একেবারেই দেরি করেননি। যেহেতু তাঁর পিতা সোহাইল ইবনে আমর ছিলেন মক্কার সামাজিক প্রভাবের এক মূর্তিমান প্রতিষ্ঠান, তাই আবদুল্লাহ যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তাঁর শুধু এক পারিবারিক মতাদর্শ ত্যাগ করা হয় নি; বরং যেন নিজের নিরাপত্তার বলয় থেকে বের হয়ে চরম বিপদের মুখে দাঁড়ালেন।

তিনি দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরে মক্কায় ফিরে এলে পিতা তাঁকে বন্দি করে কঠোর শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন এবং ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। আবদুল্লাহ জীবন রক্ষার্থে ইমান ত্যাগের ভান করে যান।

অর্থাৎ তিনি পিতার সঙ্গে সংঘর্ষে গিয়ে শক্তি অপচয় করেননি; বরং উপযুক্ত সময়ের জন্য ভেতরের বিশ্বাসকে আগলে রাখেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে বদরের যুদ্ধে পিতা মক্কার কাফেরদের সঙ্গে তাঁকে জোর করে নিজের বাহিনীর সঙ্গী করে নেন।

আরও পড়ুন

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ পুরো বদলে যান এবং চরম এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। যেন তিনি এই অপেক্ষাতেই ছিলেন এতদিন। তিনি পিতার বাহিনী ত্যাগ করে এক লহমায় মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন।

বছরের পর বছর বন্দিদশা ও ইসলামের প্রতি গোপন ভালোবাসার যে পুঞ্জীভূত আবেগ ছিল, তা বদরের সেই একটিমাত্র পদক্ষেপে এক ঐতিহাসিক স্বাধীনতায় রূপ নেয়। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৪০২, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

আবু জান্দাল

আবদুল্লাহ যখন বদরে নিজের স্বাধীন পরিচয় প্রকাশ করলেন, ছোট ভাই আবু জান্দাল তখনো মক্কায় পিতার শিকলে বন্দি। আবু জান্দালের সংগ্রাম ছিল আরও বেদনাদায়ক। তিনি যাকে পিতা হিসেবে জানতেন, সেই একই ব্যক্তি তাঁর জন্য ছিলেন এক নির্মম অত্যাচারী।

হিজরি ষষ্ঠ সনে হোদাইবিয়ায় মহানবী (সা.) ও কোরাইশদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছিল। কোরাইশদের পক্ষে প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন তাঁর পিতা সোহাইল ইবনে আমর। এই সময় নাটকীয়ভাবে বন্দিশালা থেকে শিকল টেনে টেনে রক্তাক্ত অবস্থায় হোদাইবিয়ার হাজির হন আবু জান্দাল।

তিনি মুসলিম ভাইদের কাছে সাহায্য ও মুক্তির জন্য আকুতি জানান। চুক্তির শর্তে ছিল মক্কা থেকে পালিয়ে আসা মুসলিমদের ফিরিয়ে দিতে হবে। পিতা সুহাইল জেদ ধরলেন—আবু জান্দালকে মক্কায় ফিরিয়ে না দিলে চুক্তি হবে না।

তিনি মুসলিম ভাইদের কাছে সাহায্য ও মুক্তির জন্য আকুতি জানান। চুক্তির শর্তে ছিল মক্কা থেকে পালিয়ে আসা মুসলিমদের ফিরিয়ে দিতে হবে। পিতা সুহাইল জেদ ধরলেন—আবু জান্দালকে মক্কায় ফিরিয়ে না দিলে চুক্তি হবে না। যদিও তখনো চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।

মহানবী (সা.) চুক্তি রক্ষাকে প্রাধান্য দিলেন। আবু জান্দালকে বললেন, “ধৈর্য ধারণ করো এবং সওয়াবের আশা রাখো। আল্লাহ তোমার ও তোমার মতো অসহায়দের জন্য অতি শীঘ্রই মুক্তির কোনো পথ খুলে দেবেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)

ব্যাকুল আবু জান্দাল চোখের জলে পুনরায় শিকল পরে পিতার সঙ্গে মক্কায় ফিরে যান। এই দৃশ্যটি ছিল হোদাইবিয়ার ময়দানে পুরো মুসলিম কাফেলার জন্য হৃদয়বিদারক পরীক্ষা। কিন্তু আবু জান্দাল ভেঙ্গে পড়েন নি; বরং নবীজির আদেশকে তিনি আত্মিক শক্তিতে রূপান্তর করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৩১৮, মুস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

পরবর্তী সময়ে তিনি মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলে আবু বাসিরের মুক্ত দলে যুক্ত হন। তারা কোরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য এমন এক কৌশলগত চাপ তৈরি করেন যে শেষ পর্যন্ত কোরাইশরাই নবীজিকে অনুরোধ করেন চুক্তির ওই শর্তটি বাতিল করতে।

আরও পড়ুন

তারা আবু জান্দালসহ অন্য মুসলিমদের মদিনায় ডেকে নিতে বলেন।

আবু জান্দালের এই ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা প্রমাণ করে যে সংকটময় মুহূর্তে শুধু আবেগ দিয়ে নয়; বরং প্রজ্ঞা দিয়ে কীভাবে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনা যায়। (আল-আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ, ৪/৯৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৫)

বিজয়ের দিনে পিতার অনুশোচনা

৮ হিজরিতে ক্ষমতার চিত্র পুরোপুরি উল্টে গেল। যে পিতা সোহাইল একসময় নিজের সন্তানদের নিপীড়ন করেছেন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, মক্কা বিজয়ের পর তিনি প্রাণের ভয়ে নিজের ঘরে আত্মগোপন করলেন। তাঁর বড় ছেলে আবদুল্লাহর কাছে বার্তা পাঠালেন নবীজির কাছ থেকে প্রাণভিক্ষা এনে দেওয়ার জন্য।

আবদুল্লাহ বা আবু জান্দাল—কেউই অতীত নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করেননি। আবদুল্লাহ তৎক্ষণাৎ নবীজির দরবারে হাজির হয়ে পিতার জন্য সাধারণ ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মহানবী (সা.) আবেদন মঞ্জুর করলেন।

পিতার কাছে এই অভয়বার্তা নিয়ে যখন আবদুল্লাহ উপস্থিত হলেন, তখন প্রতাপশালী কোরাইশ নেতা সুহাইলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুহাইল প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন যে তাঁর সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতি সৎ ও অনুগত ছিল।

পিতার কাছে এই অভয়বার্তা নিয়ে যখন আবদুল্লাহ উপস্থিত হলেন, তখন প্রতাপশালী কোরাইশ নেতা সুহাইলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুহাইল প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন যে তাঁর সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতি সৎ ও অনুগত ছিল।

পারিবারিক ও ধর্মীয় বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সন্তানরা পিতার জীবন রক্ষায় যেভাবে এগিয়ে এসেছিল, তা সোহাইলের শক্ত হৃদয়কে মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে দেয়। পরে তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। (আত-তাবারি, তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক, ৩/৩৩০, দারুত তুরাস, বৈরুত, ১৯৬৭)

নবীজির ইন্তেকালের পর যখন পুরো আরব উপদ্বীপে ধর্মত্যাগের কঠিন সংকট তৈরি হয়েছিল, তখন এই সোহাইলই মক্কার জনগণকে ইসলামে অবিচল রাখতে কাবার প্রাঙ্গণে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। দুই ছেলের ত্যাগ ও সুমহান আচরণের বদৌলতে ধর্মবিরোধী থেকে তিনি পরিণত হয়েছিলেন মুসলমানদের দিশারীতে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/১৬৫, দারু হাজার, কায়রো, ১৯৯৭)

ছেলে আবদুল্লাহ পরে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর যুগে ভণ্ড নবীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। আর আবু জান্দাল পিতার সঙ্গে সিরিয়ার সীমান্তে ইসলাম প্রচারে অংশ নেন।

আরও পড়ুন