ইতিকাফ: আল্লাহর নৈকট্য লাভের ইবাদত

ছবি: ফ্রিপিক

আল্লাহর নৈকট্য লাভের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো ইতিকাফ। দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁর ঘর মসজিদে অবস্থানের এই যে বিধান—নিঃসন্দেহে তা বান্দার প্রতি মহান রবের এক বড় অনুগ্রহ।

বান্দার উচিত এই মহিমান্বিত বিধানের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া এবং আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে এই আমলে উৎসাহিত হওয়া।

ইতিকাফ এক  প্রাচীন বিধান

ইসলামে ইতিকাফের বিধান অত্যন্ত প্রাচীন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার ঘরকে সেই সব লোকের জন্য পবিত্র করো, যারা (এখানে) তাওয়াফ করবে, ইতিকাফ করবে এবং রুকু ও সিজদা করবে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফের বিধান হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর সময়েও ছিল।

তা ছাড়া এক হাদিসে এসেছে, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) জাহেলি যুগে মসজিদে হারামে এক রাত ইতিকাফের মানত করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর এ বিষয়ে নবীজি (সা.)–কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাঁকে সেই মানত পূরণ করার নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৩)

আরও পড়ুন

ইতিকাফের পরিচয় ও প্রকার

ইতিকাফ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো অবস্থান করা, অভিমুখী হওয়া, নিবেদিত হওয়া বা নিরবচ্ছিন্ন হওয়া। পরিভাষায় ইতিকাফ হলো—আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে দুনিয়ার যাবতীয় ব্যস্ততা গুটিয়ে এমন মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়।

নবীজি রমজানে শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি; পরবর্তী বছর ২০ রাত (দিন) ইতিকাফ করেছেন।
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৬৩

ইতিকাফ তিন প্রকার:

১. সুন্নত ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকে ২১তম রাত (অর্থাৎ ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগে) থেকে ঈদের চাঁদ দেখা পর্যন্ত ইতিকাফ করা। নবীজি (সা.) প্রতিবছর এই দিনগুলোতে ইতিকাফ করতেন, তাই একে সুন্নত ইতিকাফ বলা হয়।

২. নফল ইতিকাফ: রমজানের শেষ দশকে পূর্ণ ১০ দিনের কম ইতিকাফ করা অথবা বছরের অন্য যেকোনো সময় যতক্ষণ ইচ্ছা ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা।

৩. ওয়াজিব ইতিকাফ: মানত করা ইতিকাফ এবং সুন্নত ইতিকাফ ভেঙে গেলে তার কাজা আদায় করা।

ইতিকাফের স্থান

সওয়াবের দিক থেকে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম। এরপর মসজিদে নববী, তারপর মসজিদে আকসা। এরপর যেকোনো জামে মসজিদ ও পাঞ্জেগানা মসজিদ। তবে নারীদের জন্য ইতিকাফের স্থান হলো ঘরের নির্দিষ্ট কোনো পবিত্র জায়গা। (বাদায়েউস সানায়ে ২/২৮০-২৮১)

আরও পড়ুন

ইতিকাফের ফজিলত

ইতিকাফ ইসলামের অন্যতম একটি মাসনুন আমল। রমজানের ফজিলত ও বরকত লাভের ক্ষেত্রে ইতিকাফের ভূমিকা অপরিসীম। নবীজি মাদানি জীবনে কেবল একটি রমজানে (জিহাদের সফরে থাকায়) ইতিকাফ করতে পারেননি; পরবর্তী বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন।

এ ছাড়া তিনি সব রমজানেই ইতিকাফ করেছেন। হাদিসে এসেছে, “নবীজি রমজানে শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ইতিকাফ করতে পারেননি; পরবর্তী বছর ২০ রাত (দিন) ইতিকাফ করেছেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৬৩)

ইতিকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল কদর লাভের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) লাইলাতুল কদর লাভের আশায় রমজানের প্রথম ও মাঝের দশ দিনও ইতিকাফ করেছিলেন।

ইতিকাফের একটি বড় ফায়দা হলো—ইতিকাফকারী অত্যন্ত পবিত্র ও গুনাহমুক্ত পরিবেশে থাকেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে মসজিদে তাঁর অবস্থানটুকুই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা করেন, “যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ, আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল... সুতরাং তোমরা শেষ দশকে শবে কদর অন্বেষণ করো এবং প্রতি বেজোড় রাতে তা খোঁজ করো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৭)

ইতিকাফের একটি বড় ফায়দা হলো—ইতিকাফকারী অত্যন্ত পবিত্র ও গুনাহমুক্ত পরিবেশে থাকেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে মসজিদে তাঁর অবস্থানটুকুই ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

ফলে অবসর সময়ে কোনো নফল আমল না করলেও দিনরাত তাঁর মসজিদে থাকাই সওয়াবের কাজ হিসেবে ধরা হয়।

এভাবে ইতিকাফকারী দুনিয়ার যাবতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেন। এটি রোজার যাবতীয় হক ও আদব রক্ষা করতে সাহায্য করে। সর্বোপরি ইতিকাফ মানুষের মন ও মননে গভীর প্রভাব ফেলে এবং জীবনকে পরিশুদ্ধ করে।

আবদুল্লাহ আলমামুন আশরাফী: শিক্ষক ও লেখক

আরও পড়ুন