শহুরে ব্যস্ততা এবং প্রবাসীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অনলাইনে কোরবানির পশু বিক্রির বিজ্ঞাপন এখন বেশ জনপ্রিয়। কেউ কেউ ভাগও বিক্রি করছে।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান শুধু পশু বিক্রি নয়, বরং ক্রেতার হয়ে জবাই করা থেকে শুরু করে গোশত গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও নিচ্ছে। ইসলামের এই আধুনিক ব্যবস্থাকে কীভাবে দেখে, তার ৫ গুরুত্বপূর্ণ বিধান আলোচনা করা হলো।
১. পশুর মালিকানা নিশ্চিত করা
অনলাইন হাটের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো পশু নির্দিষ্ট করা। শুধু ‘একটি গরু’ বা ‘একটি ভাগ’ বুকিং দিলেই চুক্তি সম্পন্ন হয় না; বরং জবাইয়ের আগে কোন পশুটি কোন ক্রেতার, তা প্রতিষ্ঠানের রেকর্ডে বা ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট হতে হবে।
কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু কেনা বা নির্দিষ্ট করার মাধ্যমেই তা আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়। (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩১৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
তাই লাইভ স্ট্রিমিং বা আইডি নম্বরের মাধ্যমে ক্রেতার পশুটি আলাদা করা আবশ্যক।
২. ডিজিটাল ওজন ও মূল্যের স্বচ্ছতা
অনলাইনে অনেক সময় ‘লাইভ ওয়েট’ বা জ্যান্ত পশুর ওজনের ওপর ভিত্তি করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে ডিজিটাল স্কেল বা ওজনের পরিমাপে শতভাগ সততা বজায় রাখা এজেন্সির জন্য ফরজ। মাপে কম দেওয়া বা ত্রুটিপূর্ণ স্কেল ব্যবহার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১)
ওজনের চুক্তিটি যেন স্পষ্ট হয় এবং পরে কোনো লুকানো চার্জ যোগ করে ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলা না হয়, তা নিশ্চিত করা অনলাইন ব্যবসার অন্যতম শর্ত।
৩. পশুর বয়স ও শারীরিক সুস্থতা
অনলাইন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে ইসলামের পূর্ণ পরিপালন নিশ্চিত করতে পশুর বয়স ও সুস্থতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। গরু বা মহিষের বয়স অন্তত দুই বছর এবং ছাগলের এক বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৬৩)
পশুর চোখ, কান, পা বা অন্য কোনো অঙ্গে বড় ধরনের ত্রুটি থাকা চলবে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু কোরবানি করা জায়েজ নয়: যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, যে অত্যন্ত অসুস্থ, যে লেংড়া এবং যে অতিশয় দুর্বল।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৭)
৪. প্রতিনিধির মাধ্যমে কেনা
ইসলামে নিজের কোরবানি নিজে করা উত্তম হলেও অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া বা ‘অর্ডার’ দেওয়া সম্পূর্ণ বৈধ। একে ফিকহশাস্ত্রে ‘ওয়াকালাহ’ বলা হয়।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি বিশ্বস্ত হয় এবং তারা ক্রেতার পক্ষ থেকে পশু কেনা ও জবাই করার দায়িত্ব নেয়, তবে তা জায়েজ। ফাতাওয়ায়ে শামি অনুসারে, ‘অন্যকে কোরবানি জবাই করার অনুমতি প্রদান করা বৈধ, চাই সে অনুমতি মৌখিক হোক বা কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত হোক।’ (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩২৯, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
৫. অনলাইনে ভাগ কেনা
অনলাইনে অনেক সময় একটি গরুর সাতটি ভাগ আলাদা সাতজন ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত ব্যক্তি অংশ নিতে পারেন।
জাবির (রা.) বলেন, ‘আমরা হোদাইবিয়ার বছর নবীজির সঙ্গে ছিলাম। তখন আমরা একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩১৮)
তবে শর্ত হলো, সকল অংশীদারের নিয়ত হতে হবে ইবাদত। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)
সারকথা
ইসলাম একটি সহজতর জীবনব্যবস্থা। যদি অনলাইন এজেন্সিগুলো বিশ্বস্ততার সঙ্গে ইসলামের এই ৫টি নিয়ম মেনে পশু ক্রয় সম্পন্ন করে, তবে এই প্রক্রিয়ায় কোরবানি দিতে কোনো বাধা নেই।
তবে ডিজিটাল লেনেদেনের ক্ষেত্রে পশুর চামড়ার টাকা বা লভ্যাংশ কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের নিজের খরচে ব্যয় করা যাবে না, বরং তা এতিমখানা বা গরিবদের হক হিসেবে দান করা ওয়াজিব।