ইতিহাসের পাতায় ১১ রমজান বড় বড় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের এক কৌশলগত সন্ধিক্ষণ। এই দিনে একদিকে আব্বাসীয় বিপ্লবের কালো পতাকা উড্ডীন হয়, অন্যদিকে পারস্যে মুসলিম বিজয়ের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
আব্বাসীয় খিলাফতের সূচনা
১২৯ হিজরির ১১ রমজান (৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) ছিল উমাইয়া শাসনের শেষ এবং আব্বাসীয়দের উত্থানের এক ঐতিহাসিক লগ্ন। এই রাতে খোরাসানে আবু মুসলিম খোরাসানির নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে আব্বাসীয় বিপ্লবের ডাক দেওয়া হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৩০, ১৯৮৮)
উমাইয়াদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অনারব মুসলিমদের (মাওয়ালি) বঞ্চনাকে পুঁজি করে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এই রাতে ‘আহলে বাইত’-এর শহীদদের স্মরণে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা ছিল উমাইয়াদের সাদা পতাকার বিপরীতে রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
এই বিপ্লব খোরাসান থেকে শুরু হয়ে একে একে ইরাক ও সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং এক নতুন শক্তির জন্ম দেয়। (জালালুদ্দিন সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ২১০, ২০০৪)
বুওয়াইব যুদ্ধ
১৩ হিজরির ১১ রমজান (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) ইরাক বিজয়ের ইতিহাসে মাইলফলক। ‘সেতু যুদ্ধে’ (Battle of the Bridge) মুসলিমদের বিপর্যয়ের পর পারস্যের সাশানিদ সম্রাটরা মুসলিমদের চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করেন।
কিন্তু সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বুওয়াইব যুদ্ধে পারস্যের বাহিনীকে পরাজিত করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৪৫, ১৯৮৭)
এই যুদ্ধে পারস্য সেনাপতি মেহরান নিহত হন এবং মুসলিমরা তাঁদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। ইতিহাসবিদরা এই যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল আশার’ বা দশের দিন বলেন, কারণ এই যুদ্ধে মুসলিমদের প্রতিটি দল অন্তত দশজন শত্রুকে পরাভূত করেছিল।
এই বিজয়ই পরবর্তীতে পারস্যের রাজধানী মাদায়েন জয়ের পথ সুগম করে। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৮, ১৯৮৮)
হালাকু খানের চরমপত্র
৬৫৫ হিজরির ১১ রমজান (১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা মুতাসিম বিল্লাহর কাছে মঙ্গোল নেতা হালাকু খান আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠিয়ে এক চরমপত্র প্রদান করেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২৩/২০০, ১৯৮৫)
হালাকু খান দাবি করেন, বাগদাদের দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে এবং সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। খলিফার উজির ইবনুল আলকামি এবং সেনাপতি মুজাহিদ উদ্দিন আইবেকের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই সময় মুসলিমদের প্রতিরক্ষা বুহ্যকে দুর্বল করে দেয়।
এই চরমপত্রের কয়েক মাস পরেই বাগদাদে ভয়াবহ মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৩/২০০, ১৯৮৮)
সুলতান প্রথম সেলিমের দামেস্ক প্রবেশ
৯২২ হিজরির ১১ রমজান (১৫১৬ খ্রিষ্টাব্দ) মারজ দাবিক যুদ্ধে মামলুকদের পরাজয়ের পর ওসমানীয় (অটোমান) সুলতান প্রথম সেলিম বিনা যুদ্ধে দামেস্কে প্রবেশ করেন। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/১৮০, ১৯৮৭)
মামলুকরা আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রকে ‘অ-বীরত্বপূর্ণ’ মনে করত। কিন্তু ওসমানীয়রা বারুদ ও কামানের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। দামেস্ক বিজয়ের ফলে মামলুকদের শতবর্ষী শাসনের অবসান ঘটে এবং পবিত্র হজ কাফেলা ও বাণিজ্যপথের ওপর ওসমানীয় আধিপত্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।