ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে মানুষ পৃথিবীর সম্পদ ভোগ করার অধিকার রাখে। সেই সঙ্গে সম্পদ আহরণ, উন্নয়ন ও উৎপাদনের দায়িত্বও তার ওপর রয়েছে। পৃথিবী মানুষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে সে এর উপকরণ কাজে লাগিয়ে নিজের জীবন ও সমাজকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে তোমাদের আবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)
পৃথিবী যখন দায়িত্বের আমানত
কোরআন পৃথিবীকে মানুষের জন্য অনুগত করে দেওয়ার কথা বলেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন। অতএব তোমরা এর পথে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক থেকে আহার করো।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫)
পৃথিবীর সম্পদ তথা মাটি, পানি, বন, খনিজ, পশুসম্পদ, সমুদ্র ও নানা প্রাকৃতিক উপাদান মানুষের সামনে পড়ে আছে। এগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রেখে দেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে এসব সম্পদকে মানুষের উপকারী সম্পদে পরিণত করাই পৃথিবী আবাদ করার অন্যতম অর্থ।
কৃষকের শ্রম যেমন সম্মানিত, তেমনি কারিগর, নির্মাণশ্রমিক, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রযুক্তিবিদের বৈধ শ্রমও সমাজের উৎপাদনশীল শক্তির অংশ।
শ্রম যখন ইবাদত
উৎপাদনের প্রথম শক্তি হলো মানুষের শ্রম। ইসলাম এই শ্রমকে অবজ্ঞা করেনি। নিজের হাতে উপার্জন করাকে রাসুল (সা.) মর্যাদার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭২)
একই কারণে মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে শ্রম করে উপার্জনকে উত্তম বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ দড়ি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে জীবন চালালে মানুষের কাছে চাওয়ার চেয়ে তা তার জন্য উত্তম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৭০)
এখানে শ্রমের একটি মৌলিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষকের শ্রম যেমন সম্মানিত, তেমনি কারিগর, নির্মাণশ্রমিক, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক কিংবা প্রযুক্তিবিদের বৈধ শ্রমও সমাজের উৎপাদনশীল শক্তির অংশ।
রিজিকের সন্ধানে পৃথিবীর পথে
ইসলাম কর্মপ্রচেষ্টাকে তাওয়াক্কুলের বিপরীত মনে করে না। সালাত শেষ হওয়ার পর আল্লাহ বলেন, ‘সালাত শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।’ (সুরা জুমুআহ, আয়াত: ১০)
ইবাদতের জন্য মসজিদে যাওয়া যেমন প্রয়োজন, জীবিকার জন্য কর্মক্ষেত্রে যাওয়াও তেমনি স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থার অংশ। তাই ইসলামের তাওয়াক্কুল মানুষকে কর্মহীন করে না; বরং উপায় অবলম্বন করে ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়।
উৎপাদনের সীমানা মাটি ছাড়িয়ে
উৎপাদন বলতে কৃষিকাজকে বোঝানো হলে ইসলামের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপ্তি অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। কৃষি উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে এর পাশাপাশি শিল্প, কারিগরি, নির্মাণ, চিকিৎসা, পরিবহন, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, শিক্ষা ও নানা ধরনের সেবাও মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে।
আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি; এতে রয়েছে প্রবল শক্তি এবং মানুষের জন্য বহু উপকার।
কোরআনে লোহার কথা এসেছে, ‘আমি লোহা অবতীর্ণ করেছি; এতে রয়েছে প্রবল শক্তি এবং মানুষের জন্য বহু উপকার।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ২৫)
লোহা থেকে অস্ত্র যেমন তৈরি হয়, তেমনি তৈরি হয় কৃষিযন্ত্র, সেতু, ভবন, রেলপথ ও অসংখ্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, প্রকৃতির উপাদানকে মানুষের উপকারী সম্পদে রূপান্তর করার বিষয়টিও ইসলামি সভ্যতার অর্থনৈতিক চিন্তার অন্তর্ভুক্ত।
জ্ঞান ও দক্ষতা উৎপাদনের আসল শক্তি
শ্রম থাকলেই উৎপাদন বাড়ে না। প্রয়োজন জ্ঞান, দক্ষতা ও সঠিক পদ্ধতি। একই জমি, একই শ্রম ও একই সময়ের মধ্যে একজন কৃষক আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্যের তুলনায় বেশি ফলন পেতে পারেন। একইভাবে দক্ষ কারিগর উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করে কম সময়ে বেশি পণ্য তৈরি করতে পারেন।
এ কারণেই জ্ঞান উৎপাদনের অন্যতম শক্তি। আর ইসলামের প্রথম ওহির সূচনাই হয়েছে ‘পড়ো’ দিয়ে। জ্ঞানের ইসলামের মনোভাব অত্যন্ত উদার। জ্ঞান মানুষকে প্রকৃতির সম্পদ বুঝতে শেখায়, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পথ খুলে দেয় এবং উৎপাদনের পদ্ধতিকে উন্নত করে।
ফলে ইসলামের জ্ঞানচর্চা মানুষের আত্মিক উন্নতির পাশাপাশি তার পার্থিব জীবনকেও সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করে।
দক্ষতার বিভাজন, সমৃদ্ধির পথ
একজন মানুষ সমাজের সব প্রয়োজন একা পূরণ করতে পারে না। কেউ খাদ্য উৎপাদন করবে, কেউ পোশাক তৈরি করবে, কেউ ঘর নির্মাণ করবে, কেউ চিকিৎসা দেবে, কেউ প্রযুক্তি তৈরি করবে। মানুষের যোগ্যতা ও দক্ষতার এই বৈচিত্র্যই সমাজের উৎপাদনব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়।
এ জন্য কাজের বিশেষায়ন ও শ্রমবিভাজন উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে দক্ষ শ্রমশক্তির সঙ্গে প্রয়োজন পুঁজি, প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা। ইসলামি অর্থায়নের বিভিন্ন পদ্ধতিতেও এই সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।
মুশারাকা, মুদারাবা, সালাম, ইস্তিসনা, মুজারাআত ও মুসাকাত—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও অন্যান্য উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থ ও শ্রমকে একত্র করার সুযোগ তৈরি হয়।
সম্পদ সৃষ্টি ও মানবকল্যাণ
ইসলামে উৎপাদনের উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদনের একটি বড় উদ্দেশ্য মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা।
রাসুল বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম গাছ লাগালে বা শস্য উৎপাদন করলে তা থেকে পাখি, মানুষ কিংবা কোনো প্রাণী খেলে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
এখানে উৎপাদন একটি সামাজিক কল্যাণে পরিণত হয়েছে। একজন উৎপাদক নিজের জন্য আয় করেন, একই সঙ্গে সমাজের খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণে অবদান রাখেন।
একটি সমাজের শক্তি অনেকখানি নির্ভর করে সে কতটা উৎপাদন করতে পারে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করতে পারে এবং সেই উৎপাদন কতটা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে।
ইসলাম উৎপাদনে উৎসাহ দিয়েছে, তবে উৎপাদনের নামে মানুষের ক্ষতি করার অনুমতি দেয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীকে সংস্কারের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ৫৬)
তাই ভেজাল পণ্য তৈরি, ক্ষতিকর দ্রব্য উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার নষ্ট করা, পরিবেশ ধ্বংস করা কিংবা মানুষের প্রয়োজনকে অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ইসলামের উৎপাদননীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উৎপাদনের সঙ্গে তাই হালাল-হারাম, আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও মানুষের কল্যাণ যুক্ত। উৎপাদন যত বড় হবে, তার সামাজিক দায়িত্বও তত বাড়বে।
উৎপাদন-সক্ষম সমাজই সমৃদ্ধ সমাজ
ইসলামের উৎপাদন চিন্তার মূল কথা হলো মানুষ কর্মঠ হবে, পৃথিবীর সম্পদ কাজে লাগাবে, জ্ঞান অর্জন করবে, দক্ষতা বাড়াবে, বৈধ উপায়ে সম্পদ সৃষ্টি করবে এবং সেই সম্পদ মানুষের কল্যাণে প্রবাহিত করবে।
এখানে কৃষি আছে, শিল্প আছে, কারিগরি আছে, ব্যবসা আছে, প্রযুক্তি আছে, নির্মাণ আছে, জ্ঞানচর্চা আছে, সেবা খাতও আছে। অর্থাৎ উৎপাদন ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনের বিস্তৃত একটি কর্মপরিসর।
একটি সমাজের শক্তি অনেকখানি নির্ভর করে সে কতটা উৎপাদন করতে পারে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করতে পারে এবং সেই উৎপাদন কতটা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে।
এই জায়গাতেই ইসলামের উৎপাদন চিন্তার স্বাতন্ত্র্য, শ্রম ও তার হাতিয়ার, জ্ঞান ও তার শক্তি, হালাল উপার্জন ও তার ভিত্তি, মানুষের কল্যাণ ও তার লক্ষ্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি তার চূড়ান্ত প্রেরণা।