কোরআন যখন কোনো উপমা দেয়, তখন একটি পরিচিত দৃশ্যের আড়ালে মানুষের জন্য গভীর কোনো সত্যকে তুলে ধরে। কখনো একটি বৃক্ষের মাধ্যমে ভালো ও মন্দ কথার পরিণতি বোঝায়, কখনো পিঁপড়ার আচরণ দিয়ে সামাজিক দায়িত্বের শিক্ষা দেয়।
আবার মরীচিকা ও সমুদ্রের অন্ধকারের দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের আমল ও কুফরের ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে তুলে ধরে। ইতিপূর্বে আমরা প্রাণপ্রকৃতির বেশ কিছু চমৎকার উপমা দেখেছি। এখানে আরও কয়েকটি উপমা উপস্থাপন করা হলো।
৮. বৃক্ষ দিয়ে ভালো ও মন্দ বাক্যের উপমা
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ কীভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ, যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা ওপরে বিস্তৃত, যা সব সময় তার রবের অনুমতিক্রমে তার ফলদান করে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ পেশ করে থাকেন, যাতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে। আর মন্দ বাক্যের তুলনা এক মন্দ গাছ, যার মূল ভূপৃষ্ঠ হতে বিচ্ছিন্নকৃত, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ২৪-২৬)
কেয়ামতের দিন পুনরুত্থানের পর সে দেখল—যেসব আমলের ওপর সে ভরসা করেছিল, তা তার কোনো কাজে আসছে না। তখন তার অবস্থা সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের মতোই হবে।
একটি বৃক্ষের দৃশ্যের মাধ্যমে কোরআন ভালো ও মন্দ বাক্যের প্রকৃতি কত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে! ভালো বাক্যকে এমন উৎকৃষ্ট বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার শিকড় সুদৃঢ়, শাখা-প্রশাখা ঊর্ধ্বমুখী এবং যা নিয়মিত ফল দেয়।
অর্থাৎ সত্য ও কল্যাণের কথা গভীর ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রভাবও স্থায়ী ও ফলপ্রসূ হয়। বিপরীতে মন্দ বাক্য এমন গাছের মতো, যার শিকড় মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন; তাই তার কোনো স্থায়িত্ব নেই। কী অপূর্ব অলংকার! একটি দৃশ্যমান বৃক্ষের দৃঢ়তা ও পতনের চিত্র দিয়ে কোরআন অদৃশ্য কথার শক্তি ও দুর্বলতাকে চোখের সামনে এনে দিয়েছে।
৯. পিঁপড়ার দলবদ্ধতা দিয়ে উপমা
‘যখন তারা পিপীলিকা–অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক পিপীলিকা বলল, হে পিপীলিকাদল! তোমরা তোমাদের বাসায় প্রবেশ করো, নয়তো সুলাইমান এবং তাঁর বাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদের পদতলে পিষে ফেলবে।’ (সুরা নামল, আয়াত ১৮)
এটি পবিত্র কোরআনের একটি চমৎকার উপমা। এই আয়াতে একটি ছোট পিঁপড়ার সতর্কবার্তার দৃশ্যের মাধ্যমে মানুষের মনে পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
নবী সোলাইমান (আ.)-এর বাহিনী সামনে আসতে দেখে একটি পিঁপড়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে একা সরে যায়নি; বরং পুরো দলকে সতর্ক করে বলেছে, তোমরা নিজেদের বাসায় প্রবেশ করো।
অর্থাৎ বিপদ এলে শুধু নিজেকে বাঁচানো নয়, অন্যদের নিরাপদ রাখার চেষ্টাও করতে হবে। সমাজে বসবাসকারী মানুষের দায়িত্বও এমনই। প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা সমাজের অন্য মানুষের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করে তাদের সতর্ক করা, সাহায্য করা এবং কল্যাণ কামনা করা সামাজিক দায়িত্বেরই অংশ।
মরীচিকার পেছনে ছুটে যাওয়া মানুষটি দুনিয়াতেই তার ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু কাফের তার আমলের প্রকৃত পরিণতি এমন সময় বুঝবে, যখন আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।
১০. কাফেরের পরিণতির উপমা
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর যারা কুফরি করে তাদের আমলসমূহ মরুভূমির মরীচিকার মতো, পিপাসায় কাতর ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু যখন সে সেটার কাছে উপস্থিত হয়, তখন দেখে সেটা কিছুই নয়। আর সে সেখানে আল্লাহকে পায়; অতঃপর তিনি তাকে তার হিসাব পূর্ণমাত্রায় দেন। আর আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা নুর, আয়াত ৩৯)
এই আয়াতে কাফেরের আমলের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে । কল্পনা করুন, দুনিয়ায় একজন অনেক আমল করেছে, হয়তো মানুষের প্রশংসাও পেয়েছে, নিজের আমল নিয়ে তার গর্বও হতো, আর সে ভাবত—মৃত্যুর পর অবশ্যই সে এসব আমলের প্রতিদান পাবে।
কিন্তু কেয়ামতের দিন পুনরুত্থানের পর সে দেখল—যেসব আমলের ওপর সে ভরসা করেছিল, তা তার কোনো কাজে আসছে না। তখন তার অবস্থা সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের মতোই হবে, যে মরুভূমিতে পানির আশায় ছুটে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সেখানে কিছুই পেল না।
পার্থক্য হলো, মরীচিকার পেছনে ছুটে যাওয়া মানুষটি দুনিয়াতেই তার ভুল বুঝতে পারে; কিন্তু কাফের তার আমলের প্রকৃত পরিণতি এমন সময় বুঝবে, যখন আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।
পবিত্র কোরআনের এই উপমা আমাদের সতর্ক করে দেয়—ইমানহীন আমল যত বড়ই মনে হোক, আখিরাতে তা মরীচিকার মতো ‘নাই’ হয়ে যাবে।
১১. সমুদ্রের অন্ধকার দিয়ে কুফরের উপমা
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অথবা (ওদের আমলের উপমা) গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকার সদৃশ, তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ যাকে আচ্ছন্ন করে, যার ঊর্ধ্বদেশে ঘন মেঘ, এক অন্ধকারের ওপর আরেক অন্ধকার, কেউ নিজ হাত বার করলে তা প্রায় দেখতেই পায় না। আর আল্লাহ যাকে আলো দান করেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।’ (সুরা নুর, আয়াত ৪০)
সত্যকে অস্বীকার করার অন্ধকার, ভ্রষ্টতা ও শিরকি বিশ্বাসের অন্ধকার; এর সঙ্গে আছে নিজের প্রতিপালক ও পরকালের শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকার।
আগের উপমায় কাফেরদের আমলের পরিণতি বোঝানো হয়েছিল; আর এই উপমায় দেখানো হয়েছে তাদের কুফরের অন্ধকারময় জীবন। একজন কাফের যেন সারা জীবন একের পর এক অন্ধকারের মধ্যে ডুবে থাকে।
কুফর ও অবিশ্বাসের অন্ধকার, সত্যকে অস্বীকার করার অন্ধকার, ভ্রষ্টতা ও শিরকি বিশ্বাসের অন্ধকার; এর সঙ্গে আছে নিজের প্রতিপালক ও পরকালের শাস্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার অন্ধকার। একের পর এক এসব অন্ধকার তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরে যে তার সামনে হেদায়েতের পথ থাকলেও সে তা দেখতে পায় না।
যেমন গভীর অন্ধকারে মানুষ নিজের হাত সামনে মেলে ধরেও তা দেখতে পায় না, তেমনই কুফরের অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষ সত্য একেবারে সামনে থাকার পরও তা চিনতে পারে না।
মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক