বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় রমজান মানে জাতীয় উৎসবের মাস। ১৮ হাজার দ্বীপের এই বিশাল আর্চিপেলাগোতে (দ্বীপপুঞ্জ) রমজান আসে সংস্কৃতির বিচিত্র রঙ মেখে।
এখানে সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই রমজানকে বরণ করে নেন অনন্য রাজকীয় ভঙ্গিতে।
‘নিয়াদরান’ বা ‘জিয়ারত কুবরা’
এ–দেশে রমজানকে স্বাগত জানানোর সবচেয়ে আবেগপূর্ণ প্রথা হলো ‘জিয়ারত কুবরা’ বা ‘নিয়াদরান’। চাঁদ দেখার আগেই পরিবারের সবাই মিলে মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবরে যান।
সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও দোয়ার পাশাপাশি তারা দরিদ্রদের খাবার দান করেন। মূল উদ্দেশ্য হলো নিজেদের আত্মাকে শুদ্ধ করে পবিত্র মাসে প্রবেশ করা।
পদঙ্গবাসীর পবিত্র গোসল
পশ্চিম সুমাত্রার পদঙ্গ প্রদেশে এক অদ্ভুত প্রথা দেখা যায়। সেখানে রমজানের আগে হাজার হাজার মানুষ নদীতে নেমে গোসল করেন। অনেকে লেবুর রস মেশানো জল দিয়ে শরীর ধুয়ে নেন।
তাদের বিশ্বাস, এটি কেবল দেহের ময়লা নয়, বরং মনের সব কলুষতা ধুয়ে রমজানের জন্য প্রস্তুত করে।
ইফতারের টেবিলে ‘কলাক বিসাং’
ইন্দোনেশিয়ার ইফতারের মেনু মানেই নারিকেলের দুধ আর প্রাকৃতিক ফলের সমাহার।
কলাক বিসাং: এটি ইফতারের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিষ্টি পদ। কলা, মিষ্টি আলু এবং নারিকেলের দুধের সঙ্গে লাল চিনি ও পান্ডান পাতা ফুটিয়ে এই সুস্বাদু খাবারটি তৈরি করা হয়।
বুপুর: এটি এক প্রকার চালের জাউ বা পরিজ, যার ওপরে মুরগির মাংস, বাদাম এবং প্রচুর মসলা দেওয়া হয়।
সবুজ ও রঙিন শরবত: ইফতারের টেবিলে দেখা যায় নানা রঙের সিরাপ এবং ঐতিহ্যবাহী ‘তিমুন সুরি’ (এক প্রকার শসা-তরমুজ জাতীয় ফল)–এর শরবত।
‘পেদুক’ ড্রামের গর্জন
রমজানের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার রাজপথে নেমে আসে ট্রাক ভর্তি বিশাল বিশাল ঢোল, যাকে বলা হয় ‘পেদুক’। গভীর রাতে সেহরির সময় মানুষকে জাগানোর জন্য তরুণরা এই ড্রাম বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়।
সহমর্মিতায় রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণ
ইন্দোনেশিয়ার সরকার প্রতি বছর এই মাসে কর্মীদের অতিরিক্ত এক মাসের বেতন প্রদান করে। অফিস-আদালত দুপুর ২টার মধ্যেই ছুটি হয়ে যায়। স্কুল-কলেজে চলে বিশেষ ধর্মীয় ক্লাস বা ‘তাদারুস’।
আর ঈদকে সামনে রেখে শহর থেকে গ্রামে ফেরার যে জনস্রোত শুরু হয়, তাকে বলা হয় ‘মুদিক’।
ফিলিস্তিনের প্রেম
রাজধানী জাকার্তার আইকনিক ইস্তিকলাল মসজিদ (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মসজিদ) রমজানে হয়ে ওঠে মিলনমেলা। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য ইফতারের দস্তরখান বিছানো হয়।
মজার ব্যাপার হলো, ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমরা তাদের ইফতারের দোয়ায় সবসময় ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের মুক্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেন।