ইতিহাসের বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে আল্লাহ মুসলমানদের পথ দেখানোর জন্য এমন কিছু মনীষী প্রেরণ করেন, যাঁরা দূরদর্শিতা ও ইখলাসের সঙ্গে জাতির আসল রোগনির্ণয় করতে পারেন। শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.) ছিলেন এমনই এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব।
তিনি মাল্টায় চার বছরের বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেয়ে যখন দারুল উলূম দেওবন্দে (দেওবন্দ মাদ্রাসা) এলেন, তখন আলেমদের সমাবেশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছিলেন।
আলেমদের সেই ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি মুসলমানদের পুনরুজ্জীবনের জন্য যে অমূল্য দুটি বার্তার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
যারা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের এ কথা অজানা নয় যে তাঁর এই কারাবরণ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক নেতার মতো ছিল না। উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে তাঁর সমস্ত আন্দোলন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মুসলমানদের সংশোধন ও কল্যাণের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল।
পরবাসে এবং অসহায় অবস্থায় গ্রেপ্তার হওয়ার মুহূর্তে তাঁর পবিত্র মুখ থেকে যে কথাটি উচ্চারিত হয়েছিল, তা তাঁর দৃঢ় সংকল্প ও মহান লক্ষ্যের সাক্ষ্য দেয়। তিনি বলেছিলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আমি মুসিবতের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছি, কোনো অপরাধের জন্য নয়।’
কারাগারের নির্জনতায় একদিন তাঁকে খুব বিষণ্ণ দেখে কতিপয় সঙ্গী তাঁকে সান্ত্বনা দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এ আর কিসের কষ্ট, যা একদিন শেষ হয়েই যাবে! আসল চিন্তা তো হলো, এই কষ্ট ও পরিশ্রম মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হলো কি না?’
মাল্টার বন্দিদশা থেকে ফিরে আসার পর একদিন এশার নামাজের পর তিনি দারুল উলূমে উপস্থিত ছিলেন। সামনে আলেমদের এক বিশাল জামাত বসা ছিল। সে সময় তিনি বললেন:
‘আমি মাল্টার কারাজীবন থেকে দুটি শিক্ষা অর্জন করেছি…’
এ কথা শুনে পুরো মজলিস গভীর মনোযোগ দিয়ে কান পেতে রইল—জীবনভর আলেমদের পাঠদানকারী এই উস্তাযুল ওলামা ও দরবেশ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন কী নতুন বিষয় শিখলেন
তিনি বললেন, ‘কারাগারের নির্জনতায় বসে আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি, সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা কেন ধর্মি ও পার্থিব—সব দিক থেকেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? এর দুটি মূল কারণ আমার কাছে ধরা পড়েছে:
১. তাদের কোরআন পরিত্যাগ করা।
২. তাদের নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধ ও গৃহযুদ্ধ।
তাই আমি সেখান থেকেই এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এসেছি যে আমার অবশিষ্ট জীবন এই কাজে উৎসর্গ করব, যেন কোরআনে কারিমকে শব্দে ও অর্থে সবার কাছে সর্বজনীন করে তোলা যায়।
শিশুদের জন্য প্রতিটি জনপদে কোরআন শিক্ষার মক্তব প্রতিষ্ঠা করা হবে; বয়স্কদের জন্য সাধারণ “দরসে কোরআন”-এর মাধ্যমে কোরআনের মর্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে এবং কোরআনি শিক্ষার ওপর আমল করার জন্য তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হবে। আর মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহ ও বিবাদ কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না।’
আজও মুসলমানরা যেসব বিপদে জড়িয়ে পড়েছে এবং যেসব দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, দূরদর্শিতার সঙ্গে বিচার করলে দেখা যাবে তার প্রধান কারণ কিন্তু এই দুটিই—কোরআন ছেড়ে দেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে লড়াই-বিবাদে লিপ্ত হওয়া।
মুসলমানদের এই অভিজ্ঞ চিকিৎসক মুসলিম জাতির ব্যাধির যে নিদান ও পথ্য নির্ধারণ করেছিলেন, জীবনের বাকি দিনগুলোতে দুর্বলতা, অসুস্থতা এবং কাজের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও তিনি এর বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
তিনি নিজেই ‘দরসে কোরআন’ শুরু করেছিলেন, যেখানে শহরের সব আলেম ছাড়াও দেওবন্দ মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস হোসাইন আহমদ মাদানি ও মাওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানির মতো শীর্ষস্থানীয় আলেমরাও শরিক হতেন।
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এই অধমেরও (মুফতি মুহাম্মাদ শফী) সেই দরসে অংশ নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু এ ঘটনার পর তাঁর জীবন আর মাত্র গুটিকয় দিনই অবশিষ্ট ছিল। ১৯২০ সালের মে মাসে তিনি মুক্তি বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেলেও ৩০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
হায়, ভেঙে গেল সুধার পেয়ালা, সাাকিও রইল না আর।
আজও মুসলমানরা যেসব বিপদে জড়িয়ে পড়েছে এবং যেসব দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে, দূরদর্শিতার সঙ্গে বিচার করলে দেখা যাবে তার প্রধান কারণ কিন্তু এই দুটিই—কোরআন ছেড়ে দেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে লড়াই-বিবাদে লিপ্ত হওয়া।
গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, পারস্পরিক এই বিবাদও মূলত কোরআন ছেড়ে দেওয়ারই এক অনিবার্য পরিণতি। অন্যথায় কোরআনের শিক্ষার ওপর যদি সামান্যতমও আমল করা হতো, তবে মুসলমানদের অন্তর্দ্বন্দ্ব কখনোই এমন শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছাত না।
শাইখুল হিন্দ (রহ.) মাল্টার কারাগার থেকে নিয়ে এসেছিলেন সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট মুক্তির সনদ, যা আজকের বিশৃঙ্খল ও দিগ্ভ্রান্ত মুসলিম বিশ্বের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
যদি আজ আমরা সত্যিকার অর্থেই উম্মাহর ঐক্য ফিরিয়ে আনতে চাই এবং সব ধরনের বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে চাই, তবে শায়খুল হিন্দের এই শেষবার্তার আলোকে কোরআনমুখী হওয়া এবং অনর্থক বিভেদ ও সংঘাত পরিহার করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: ওয়াহদাতে উম্মত, মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.), পৃ. ৩৯-৪০
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও প্রোগ্রামার