বিপদের ঢেউ যখন ক্রমাগত আছড়ে পড়ে জীবন তীরে, তখন অনেকেই সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কামনা করে। মনের অজান্তে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে কেউ, ‘এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই ভালো।’
তবে মুমিনের পথচলা অন্য সবার মতো নয়। সে বিশ্বাস করে, দুনিয়ার কোনো কিছুই দৃশ্যমান কারণ দ্বারা পরিচালিত হয় না। এর পেছনে রয়েছে সর্বজ্ঞ ও পরম প্রজ্ঞাবান রবের সিদ্ধান্ত।
রাসুল (সা.) তার জীবদ্দশায় ৭ সন্তানের ৬ জনকেই হারিয়েছেন, একই বছর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিবের মৃত্যুতে গভীর শোক পেয়েছেন, তায়েফে রক্তাক্ত হয়েছেন। তারপরও তিনি প্রতিটি বিপদকে বানিয়েছেন আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার উপলক্ষ্য।
দুনিয়া পরীক্ষার হল
আল্লাহ–তাআলা পৃথিবীকে জান্নাত বানাননি, বানিয়েছেন পরীক্ষার হল। এখানে প্রাপ্তির মতো অপ্রাপ্তিও থাকবে, হাসির মতো কান্নাও থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল–ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
বিপদ আল্লাহর পরীক্ষারই অংশ। তাই বিপদ আসা মানেই আল্লাহ বান্দাকে পরিত্যাগ করেছেন, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অনেক সময় যাদের আল্লাহ বেশি ভালোবাসেন, তাদেরই বেশি পরীক্ষা করেন। কারণ, পরীক্ষার আগুনেই ইমান খাঁটি সোনার মতো দীপ্ত হয়ে ওঠে।
আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল–ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।
বিপদে মৃত্যু কামনা নিষিদ্ধ
জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে মানুষ বর্তমানের কষ্ট ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। মনে হয়, মৃত্যুই বুঝি সব যন্ত্রণার অবসান। অথচ মানুষের জ্ঞান সীমিত, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার কোনো নিশ্চিত ধারণা নেই।
আজ যে মানুষটি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করছে, হয়তো আগামীকালই আল্লাহ তার জীবনে এমন পরিবর্তন আনবেন, যা কল্পনারও অতীত।
এ কারণেই রাসুল (সা.) মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদের কারণে মৃত্যুর কামনা না করে। যদি একান্তই কিছু বলতে হয়, তবে বলবে, হে আল্লাহ, যত দিন জীবিত থাকা আমার জন্য কল্যাণকর, তত দিন আমাকে জীবিত রাখুন। আর যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দান করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭১)
হাদিসে নবীজি (সা.) শুধু মৃত্যুর কামনা থেকে বিরত থাকতে বলেননি; বরং এর পরিবর্তে এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যার প্রতিটি শব্দ আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের নিদর্শন।
জীবন আল্লাহ প্রদত্ত আমানত
ধনসম্পদ, পরিবার, জ্ঞান, ক্ষমতাসহ মানুষের হাতে পৃথিবীর অনেক কিছু অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু এসবের চেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ, সেটি হলো জীবন।
এই জীবন মানুষ নিজের ইচ্ছায় অর্জন করেনি, নিজের শক্তিতে ধরে রাখতেও পারে না। প্রতি মুহূর্তে হৃৎস্পন্দন সচল রাখা ও নিশ্বাস চলমান রাখা আল্লাহর অপার অনুগ্রহের ফল।
অনেক সময় একটা বিপদ মানুষকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। যে মানুষটি বিপদ না এলে হয়তো কখনোই আল্লাহর সামনে চোখের পানি ফেলত না, সেই মানুষটিই বিপদে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে ওঠে।
ইসলাম জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে। বস্তুত, জীবন শেষ হয়ে গেলে আমলের দরজাও চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। এ জন্য মৃত্যুর কামনা না করে প্রতিটি নিশ্বাসকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করা অবশ্য কর্তব্য।
মেঘের আড়ালে রোদ হাসে
অনেক সময় একটা বিপদ মানুষকে পাপের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। যে মানুষটি বিপদ না এলে হয়তো কখনোই আল্লাহর সামনে চোখের পানি ফেলত না, সেই মানুষটিই বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে ওঠে।
এ কারণেই রাসুল (সা.) কোনো কষ্টকে নিছক দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখেননি। তিনি বলেছেন, ‘মুমিনের কোনো ক্লান্তি–শ্রান্তি, দুঃখ, কষ্ট, রোগ ও ব্যাধি, এমনকি যে দুশ্চিন্তা তাকে পীড়িত করে, এসবের বিনিময়ে আল্লাহ তার পাপ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪১)
নিরাশা মানুষকে আল্লাহর রহমত সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়। এ জন্য আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া অনুচিত। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ