ইসলাম মানুষের জীবনকে কৃচ্ছ্রসাধনের অন্ধকারে আবদ্ধ না করে বৈধ স্বাচ্ছন্দ্য গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। তবে সেই অনুমতির সঙ্গে শিখিয়েছে সংযম ও ভারসাম্য।
মানুষ খাবে, পরবে, ব্যয় করবে এবং আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করবে, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই সীমা অতিক্রম কিংবা অপচয় করবে না। মানবজীবনে অপচয়ের সাতটি প্রভাব হলো—
১. আল্লাহর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়া
একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মহান আল্লাহর ভালোবাসা। সম্পদ, সম্মান, নেতৃত্ব কিংবা ক্ষমতা যত মূল্যবানই হোক, রবের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
এ সংক্ষিপ্ত নির্দেশনার মধ্যেই অপচয়বিরোধী ইসলামি দর্শনের মূল কথা নিহিত রয়েছে।
২. অপচয়কারী শয়তানের ভাই
শয়তান মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার প্রবণতা সৃষ্টি করতে চায়। অপচয়ও মানুষকে এমন এক মানসিকতার দিকে নিয়ে যায়, যেখানে সে প্রাপ্ত নেয়ামতের যথাযথ মূল্য না দিয়ে অবহেলায় তা নষ্ট করে।
এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭)
আয়াতে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। এটি অপচয়ের চরিত্রগত বিপজ্জনক দিকটি তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষা।
৩. নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা
অপচয়ের একটি গুরুতর প্রভাব হলো অন্তর থেকে নেয়ামতের প্রকৃত মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়া। একটি খাদ্য কণার পেছনে অগণিত মানুষের পরিশ্রম আর আল্লাহর অপরিসীম করুণা জড়িয়ে থাকে। এ বোধ যার অন্তরে জাগ্রত থাকবে, তার বিবেক কোনো কিছু নষ্ট করতে সায় দেবে না। আল্লাহর এসব নেয়ামত তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার দাবি রাখে।
মহান আল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব আর তোমরা অকৃতজ্ঞ হলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)
কেবল মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম কৃতজ্ঞতা নয়, প্রকৃত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায় নেয়ামতের যথাযথ ব্যবহারে। অর্থসম্পদের অপচয় অকৃতজ্ঞতারই বাহ্যিক রূপ।
অপচয়ের অভ্যাস কখনো কখনো এমন এক জীবনদর্শনে পরিণত হয়, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষাই মানুষের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
৪. নেয়ামত পরিবর্তনের আশঙ্কা
মানুষ যখন কোনো অনুগ্রহের যথাযথ মূল্য না দেয়, তখন তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ইতিহাসে বহু জাতি প্রাচুর্য ও ক্ষমতা পেয়েও তা সংরক্ষণ করতে পারেনি, অকৃতজ্ঞতার ফলে তাদের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল।
কোরআনে এসেছে, ‘এটি এ কারণে যে আল্লাহ কোনো জাতিকে যে নেয়ামত দান করেছেন, তারা নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি তা পরিবর্তন করেন না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৫৩)
অপচয় কোনো সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করলে তার ক্ষতি কেবল দু–একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য নষ্ট হলে খাদ্যের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, পানির অপব্যবহার করলে পানিসংকট তৈরি হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অসংযত ব্যবহারে জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয় এবং এর প্রভাব একসময় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যক্তিপর্যায়ের অসচেতনতা তখন সামষ্টিক বোঝায় পরিণত হয়।
৫. প্রাচুর্যের মোহে আখিরাতবিমুখ হয়ে পড়া
অপচয়ের অভ্যাস কখনো কখনো এমন এক জীবনদর্শনে পরিণত হয়, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষাই মানুষের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চাহিদা জন্ম নিতে থাকে। একটি প্রাপ্তি আরেকটি প্রাপ্তির ক্ষুধা বাড়ায়। মৃত্যু ছাড়া এ প্রতিযোগিতার কোনো শেষ গন্তব্য নেই।
আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফিল করে রেখেছে, এমনকি তোমরা কবরস্থানে পৌঁছে গেছ।’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২)
জীবনের সব অর্জন যদি ভোগবিলাস ও প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় হয়, তাহলে আখিরাতের প্রস্তুতি ক্রমেই গুরুত্ব হারাতে থাকে। অপচয় কখনো কখনো মানুষের অন্তর থেকেও জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যকে বিস্মৃত করে দেয়।
৬. পরকালীন জবাবদিহি
মানুষের হাতে যে সম্পদ রয়েছে, তা নিয়ে সে একদিন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। উপার্জনের উৎস যেমন প্রশ্নের বিষয়, তেমনি ব্যয়ের খাতও জবাবদিহির অন্তর্ভুক্ত।
নবীজি (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, (তার মধ্যে একটি হলো) তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭)
তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯
এ হাদিস মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে পরকালীন দায়বদ্ধতাকেও যুক্ত করে দিয়েছে। অপচয়ের ক্ষেত্রে এ জবাবদিহির অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খাতে ব্যয় করা বৈধ হলেই তা সব সময় প্রশংসনীয় হয় না। তাই ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় সীমা লঙ্ঘন করার বিষয়েও মুমিনকে ভাবতে হবে।
৭. অর্থনৈতিক সংকট
অসংযত ব্যয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিণতি হলো অর্থনৈতিক সংকট। অপ্রয়োজনীয় খরচ যদি কারও নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে সে একসময় অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
কোরআনে এসেছে, ‘তোমার হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং একেবারে পুরোপুরি প্রসারিতও করো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৯)
এখানে দুটি চরম অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। একদিকে কৃপণতা, অন্যদিকে লাগামহীন ব্যয়। ইসলামের শিক্ষা মাঝামাঝি পথ। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উদারতা আর অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংযম।
অপচয় এমন একটি ব্যাধি, যার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না। একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা, অসুস্থ সময়ের প্রস্তুতি কিংবা হঠাৎ নেমে আসা সংকট—এসব বিবেচনায় রেখে ব্যয় করা দূরদর্শী মানুষের গুণ। সুতরাং মিতব্যয়িতা দারিদ্র্যের প্রতীক নয়, এটি ভবিষ্যৎ-সচেতনতার পরিচয়।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা