রমজানের পবিত্র চাঁদ দেখা দিলেই আলজেরিয়ার অলিগলিতে এক জাদুকরী পরিবর্তন আসে। উত্তর আফ্রিকার এই বৃহত্তম দেশটিতে রমজান তাদের হাজার বছরের ইতিহাস, আন্দালুসীয় সংস্কৃতি এবং অটোমান ঐতিহ্য মিলেমিশে একাকার করে দেয়।
ইফতার টেবিল পরিণত হয় জীবন্ত জাদুঘরে, যেখানে প্রতিটি পদের পেছনে লুকিয়ে থাকে দেশজ সংগ্রামের গল্প আর আতিথেয়তার অনন্য নজির।
ইফতারের প্রধান আকর্ষণ
আলজেরিয়ার ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘শোরবা ফ্রিক’। মূলত কচি সবুজ গম (ফ্রিক) দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঘন স্যুপ। এর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এই ফ্রিক তৈরির কৌশল উত্তর আফ্রিকায় এলেও, অটোমান শাসনামলে (১৫১৮-১৮৩০) আলজেরীয় রান্নাঘরে তা এক বিশেষ রূপ ধারণ করে।
ঘন ঝোল, মাংস, টমেটো এবং ধনেপাতার সুবাসে তৈরি এই শোরবা আলজেরীয়দের ইফতারে অপরিহার্য। তবে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে আবার ‘হারিরা’ নামক ডাল ও সবজির স্যুপও বেশ জনপ্রিয়।
শোরবার সঙ্গী হিসেবে থাকে ‘বোরাক’—এটি অনেকটা স্প্রিং রোলের মতো, যার ভেতরে কিমা বা আলু ও পনিরের পুর দেওয়া থাকে। আর থাকে ‘তাজিন লাহলুউ’, যা কিশমিশ, খুবানি ও পাম ফল দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টি স্বাদের মাংসের পদ। এটি সাধারণত রমজানের প্রথম দিন বা বিশেষ দিনে বরকতের প্রতীক হিসেবে পরিবেশন করা হয়।
খাবারে ইতিহাস ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন
আলজেরিয়ার খাবারে বার্বার (আমাজিগ), আরব, আন্দালুসীয় এবং অটোমান প্রভাব স্পষ্ট। ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘শাকশুকা’ মূলত প্রাচীন ‘সারিদ’ বা রুটি ভেজানো মাংসের ঝোলের বিবর্তিত রূপ।
মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপিতেও এই পদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা আজও বিশেষ দিনগুলোতে পরম মমতায় রান্না করা হয়।
মিষ্টির কথা না বললেই নয়। রাজধানী আলজিয়ার্সের আভিজাত্য মিশে আছে ‘দজাইরিয়াত’ (Dziriettes) নামক মিষ্টিতে। এটি মূলত বাদাম ও চিনির পুর দেওয়া ফুলের আকৃতির এক অপূর্ব কারুকাজ করা মিষ্টি।
১৬শ শতকে আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত মুসলিমরা যখন আলজেরিয়ায় আশ্রয় নেন, তখন তারা সঙ্গে করে নিয়ে আসেন সুগন্ধি ফুলের জল ও বাদামের মিষ্টান্ন তৈরির কৌশল।
আজও প্রতিটি ঘরে মায়েরা তাদের কন্যাদের এই ‘দজাইরিয়াত’ তৈরির সূক্ষ্ম শিল্পটি শিখিয়ে দেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে আছে।
কোরআনের সুর আর পাহাড়ের আগুন
আলজেরিয়ার রমজান মানেই মিনার থেকে ভেসে আসা হাফেজদের সুমধুর কোরআন তেলাওয়াত। বিশেষ করে তারা মিসরের বিখ্যাত কারি আব্দুল বাসিত আব্দুস সামাদের কণ্ঠের দারুণ ভক্ত।
ইফতারের আগে টিভিতে বা রেডিওতে তাঁর তেলাওয়াত শোনা দেশীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি অদ্ভুত সুন্দর রীতি দেখা যায় বাতনা প্রদেশের ইয়াওরির পাহাড় সংলগ্ন গ্রামগুলোতে। সেখানে প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও শত বছরের পুরোনো প্রথা মেনে পাহাড়ের চূড়ায় আগুন জ্বালিয়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা হয়।
১৯১৬ সাল থেকে চালু হওয়া এই প্রথা আজও টিকে আছে। পাহাড়ের গুহায় যখন ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যায়, তখনই গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে যে রোজা ভাঙার সময় হয়েছে।
সম্প্রীতির মহোৎসব
আলজেরীয়রা অত্যন্ত দানশীল। এর প্রমাণ মেলে ব্লিদা শহরে আয়োজিত ‘বিশ্বের বৃহত্তম ইফতার’–এর মাধ্যমে। ২০১৮ সালে একটি চ্যারিটি সংস্থা ৫ হাজার এতিম শিশুসহ প্রায় ৬ হাজার মানুষের জন্য ফুটবল স্টেডিয়ামে বিশাল এক ইফতারের আয়োজন করে, যা গিনেস রেকর্ডে জায়গা করে নেওয়ার মতো নজির সৃষ্টি করে।
তবে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায় আলজেরিয়া ও মরক্কো সীমান্তে। রাজনৈতিক কারণে দুই দেশের সীমান্ত বন্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা যে সীমানা মানে না, তার প্রমাণ মেলে রমজানে।
সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে বসে দুই দেশের সাধারণ মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন। একপাশে আলজেরীয় ভাই, অন্যপাশে মরক্কান বন্ধু—মাঝখানে কেবল লোহার বেড়া।
রাতের শহর ও সাহ্রি
ইফতারের পর আলজেরিয়ার শহরগুলো আবার জেগে ওঠে। তারাবির নামাজের পর ক্যাফেগুলোতে ভিড় বাড়ে। মানুষ দীর্ঘ সময় আড্ডা দেয়, কফি আর মিন্ট টি পান করে।
আর সাহ্রিতে তাদের অন্যতম পছন্দের খাবার হলো ‘মাসফুফ’। মূলত কিশমিশ ও মাখন দিয়ে তৈরি এক বিশেষ ধরনের কুসকুস, যা সারাদিন শরীরে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।