অনলাইন ‘গেম’ কি কিশোরদের নিষিদ্ধ জুয়ায় টানছে

ছবি: এআই / প্রথম আলো

মোবাইলের স্ক্রিনে একটা ক্যারেক্টার। গায়ে নতুন পোশাক পরাতে হবে, হাতে দরকার বিশেষ অস্ত্র। এর জন্য লাগবে ৫০০ টাকা। ৫০০ টাকা দিলে একটা বাক্স খুলবে। ভেতরে কী মিলবে, নিশ্চিত নয়। কাঙ্ক্ষিত জিনিস না মিললে আরও ৫০০ টাকা। এভাবে কত টাকা যাবে, হিসাব থাকে না।

পাবজি, ফ্রি ফায়ার, ফিফা—এই গেমগুলো গেমগুলো দেশের কিশোর–তরুণদের কাছে এখন বেশ পরিচিত। এগুলো খেলতে টাকা লাগে না, কিন্তু ভেতরে থাকা কেনাকাটার ব্যবস্থাটা এমনভাবে সাজানো যে খরচ হতে থাকে।

এই ব্যবস্থাকে বলে ইন-গেম পারচেজ। বিষয়টা নিছক কৌতূহলের নয়, অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নও এখানে আছে।

যে ফাঁদটা দেখা যায় না

আধুনিক গেমগুলোর ব্যবসায়িক মডেল বেশ চতুর। গেমটি বিনা মূল্যে দেওয়া হয়, কিন্তু ভেতরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে খেলোয়াড় খরচ করতে উৎসাহিত হয়।

ক্যারেক্টারের পোশাক, বিশেষ অস্ত্র, অতিরিক্ত সুবিধা—এগুলো কিনতে হয় বাস্তব টাকা দিয়ে। যে কিনতে পারে, সে এগিয়ে থাকে; যে পারে না, সে পিছিয়ে পড়ে। এই প্রতিযোগিতার অনুভূতিটাই মূল টোপ।

আরও পড়ুন

এর বাইরে আছে লুট বক্স বা লাকি ড্রয়ের ব্যবস্থা। একটা নির্দিষ্ট জিনিস সরাসরি কেনা যাবে না, একটা বাক্স কিনতে হবে, ভেতরে কী আসবে ভাগ্যের ওপর নির্ভর।

মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই পদ্ধতি ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের মতোই কাজ করে, মস্তিষ্কে ডোপামিন ছাড়ে, আসক্তি বাড়ায়। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস এ কারণে লুট বক্সকে জুয়া হিসেবে আইনত নিষিদ্ধ করেছে।

ইসলাম কী বলে

ইসলাম বিনোদনকে নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু সময় ও অর্থ দুটিকেই আমানত হিসেবে দেখে। কোরআনে সফল মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘তারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৩)

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ গাফেল—সুস্থতা ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)

অর্থ ব্যয়ের প্রশ্নে কোরআন অপচয়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)

যে জিনিসের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই, কেবল স্ক্রিনের ভেতরে একটা ছবি—তার পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করাকে অপচয়ের বাইরে কী বলা যায়?

আরও পড়ুন

লুট বক্সের প্রশ্নটা আরও জটিল। টাকা দিয়ে অনিশ্চিত কিছু পাওয়ার চেষ্টা—এটা জুয়ার সংজ্ঞার কাছাকাছি যায়।

নবীজি (সা.) অনিশ্চয়তাযুক্ত যেকোনো কেনাবেচাকে নিষেধ করেছেন, যাকে ফিকহের পরিভাষায় বলে বাইউল গারার (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)

অনেক ফিকহবিদ লুট বক্সকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেন, যদিও বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা এখনো চলছে। তবে কমপক্ষে এটুকু বলা যায়, এ ব্যবস্থা সন্দেহজনক এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকার কথা ইসলামে স্পষ্টভাবে আছে।

যে খরচের হিসাব দিতে হবে

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষকে তার সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৬)

গেমের ভেতরে কেনা একটা ভার্চ্যুয়াল পোশাকের জন্য সেই প্রশ্নের উত্তর কী হবে, এটা ভাবা দরকার।

পত্রিকায় মাঝেমধ্যে খবর আসে—গেমে টাকা দিতে না পেরে কিশোর বাবার মানিব্যাগ থেকে টাকা নিয়েছে, কেউ বন্ধুর ফোন চুরি করেছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একটা নকশার অংশ। গেম কোম্পানিগুলো মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শে এ ব্যবস্থা তৈরি করেছে সচেতনভাবে।

অনলাইন গেম খেলা মানেই অন্যায় নয়। কিন্তু ইন-গেম পারচেজের পুরো কাঠামোটা বোঝা দরকার—কে লাভবান হচ্ছে, কীভাবে, কার টাকায়। একটা ভার্চ্যুয়াল পোশাকের পেছনে ৫০০ টাকা যাওয়ার আগে এই প্রশ্ন করা দরকার: এই টাকার আরও ভালো কোনো গন্তব্য ছিল কি?

আরও পড়ুন