আল্লাহকে যেভাবে ডাকলে তিনি সাড়া দেন

ছবি: পেক্সেলস

দোয়া করতে বসেছেন। ভাবছেন আল্লাহর অসংখ্য নামের মধ্যে কোন নামে তাঁকে ডাকবেন, কোন নামের তাৎপর্যই–বা কী। মনের ভেতরে অনেক কথা জমে আছে—বলতে চান, কিন্তু কোন নামে ডাকলে আল্লাহ বেশি খুশি হবেন, বুঝতে পারছেন না।

আল্লাহ এ সমস্যারও সমাধান দিয়ে রেখেছেন। তিনি নিজেই বলে দিয়েছেন কীভাবে তাঁকে ডাকতে হবে, কখন কোন নামে ডাকতে হয়।

সেই নামগুলো জানলে দোয়া আর কঠিন মনে হবে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন কাউকে নাম ধরে ডাকে তখন সেই সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও গভীর হয়। নাম ধরে ডাকা মস্তিষ্কে এমন একটি সংযোগ তৈরি করে, যা সাধারণ যোগাযোগের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী। (Carmody, D. P. & Lewis, M., 2006, Brain Research, 1116/1, এলসেভিয়ার, আয়ারল্যান্ড)

কোরআনে নাম ধরে ডাকার নির্দেশনা

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সুতরাং সেই নামগুলো দিয়েই তাঁকে ডাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮০)

মানে আল্লাহর নাম নিয়ে ডাকতে তিনিই বলেছেন। আল্লাহর প্রতিটি নামের মধ্যে নিহিত আছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ। আর সেই অর্থের উপলব্ধি নিয়ে যখন তাঁকে নাম ধরে ডাকা হয়, তখন সেই ডাক আর সাধারণ থাকে না। হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক আন্তরিক মিনতিতে পরিণত হয়।

একটি পাপ করে ক্ষমা চেয়েছি। আবার সেই পাপ করেছি। আবারও ক্ষমা চেয়েছি। এক সময় বারবার ক্ষমা চাইতে আপনার লজ্জা লাগতে পারে। কিন্তু আল্লাহ গাফফার। তিনি সীমাহীন ক্ষমাকারী।
আরও পড়ুন

কখন কোন নামে ডাকব তাঁকে

১. আর-রহমান: সীমাহীন দয়ার মালিক। আল্লাহ বলেছেন, ‘বলো, আল্লাহ বলে ডাকো অথবা রহমান বলে ডাকো। যে নামেই ডাকো না কেন, তাঁর জন্য রয়েছে সুন্দর নামসমূহ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১১০)

‘রহমান’ শব্দটা একমাত্র আল্লাহর জন্য। এই নাম অন্য কাউকে দেওয়া যায় না। শব্দটির মূলে আছে ‘রহম’ মানে গর্ভ, মাতৃস্নেহ। একজন মা যেভাবে সন্তানকে ভালোবাসেন, তার চেয়েও অনেক বেশি দয়া আল্লাহর।

যখন মনে হচ্ছে পাপ অনেক বেশি হয়ে গেছে, তখন ‘ইয়া রহমান’ বলে ডাকুন। কারণ, এই নামের অর্থই হলো তাঁর দয়ার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।

২. আল-গাফফার: বারবার ক্ষমাকারী। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর নিশ্চয়ই আমি তার জন্য অত্যন্ত ক্ষমাশীল যে তাওবা করে, ইমান আনে, সৎ কাজ করে এবং সঠিক পথে চলে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৮২)

‘গাফফার’ শব্দটি ব্যাকরণমতে ‘মুবালাগা’র, মানে অতিমাত্রায়, বারবার। শুধু ‘গাফির’ বা সাধারণ ক্ষমা করায় সীমাবদ্ধ নন, বরং তিনি ‘গাফফার’ বা অধিক ক্ষমাকারী। তিনি হাজারবার-লক্ষবার ক্ষমা করেন।

আমরা একটি পাপ করে ক্ষমা চেয়েছি। আবার সেই পাপ করেছি। আবারও ক্ষমা চেয়েছি। এক সময় বারবার ক্ষমা চাইতে আপনার লজ্জা লাগতে পারে। কিন্তু আল্লাহ গাফফার। তিনি সীমাহীন ক্ষমাকারী। সুতরাং ‘ইয়া গাফফার’ বলে তাঁর কাছে ছুটে যান। তিনি নিশ্চয় আপনাকে ক্ষমা করবেন।

৩. আল-কারিম: চাওয়ার আগেই দেওয়া যাঁর স্বভাব। তিনি বলেছেন, ‘হে মানুষ, কোন জিনিস তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালকের ব্যাপারে প্রতারিত করল?’ (সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৬)

‘আল-কারিম’ মানে শুধু দানশীল নয়। আরবিতে ‘কারিম’ এমন মানুষকে বলে যিনি চাওয়ার আগেই দেন, চাইলে আরও বেশি দেন এবং দিতে কখনো ক্লান্ত হন না।

এই আয়াতে আল্লাহ নিজেকে ‘রাব্বিকাল কারিম’ বলছেন, যার অর্থ তোমার মহামহিম প্রতিপালক।

লক্ষ করুন—‘তোমার’। এই সম্পর্কটা ব্যক্তিগত। যখন রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, ‘ইয়া কারিম’ বলে ডাকুন। কারণ, তাঁর দানের কোনো শেষ নেই।

৪. আল-মুজিব: যিনি ডাকলে সাড়া দেন। সুরা হুদে উল্লেখ রয়েছে নবী সালেহ (আ.) বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক কাছেই আছেন এবং দোয়া কবুল করেন।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)

এখানে আরবিতে ‘কারিবুন মুজিব’ বলা হয়েছে, যার মানে যিনি নিকটে আছেন এবং ডাকলে সাড়া দেন। 

আরও পড়ুন
আয়াতে ‘গাফুর’ আর ‘ওয়াদুদ’ পাশাপাশি। ক্ষমা ও ভালোবাসা একসঙ্গে। অর্থাৎ আল্লাহ ক্ষমা করেন ভালোবাসা থেকে।

‘মুজিব’ মানে যিনি জবাব দেন। আপনার ডাক কখনো শূন্যে হারিয়ে যায় না। প্রতিটি ডাকের একটি জবাব আছে। ‘ইয়া মুজিব’ বলে ডাকলে আপনি সেই সত্তাকে ডাকছেন, যিনি কখনো নীরব থাকেন না।

৫. আল-ওয়াদুদ: যাঁর ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তিনি ক্ষমাশীল, ভালোবাসাময়।’ (সুরা বুরুজ, আয়াত: ১৪)

এখানে আরবিতে ‘ওয়াদুদ’ শব্দের উল্লেখ আছে, ‘উদ্দ’ মানে গভীর ভালোবাসা, আন্তরিক অনুরাগ। এই নামটা বলছে আল্লাহ শুধু ক্ষমা করেন না, ভালোবাসেন। পাপীকেও ভালোবাসেন যখন সে ফিরে আসে। 

এ আয়াতে ‘গাফুর’ আর ‘ওয়াদুদ’ পাশাপাশি। ক্ষমা ও ভালোবাসা একসঙ্গে। অর্থাৎ আল্লাহ ক্ষমা করেন ভালোবাসা থেকে। ‘ইয়া ওয়াদুদ’ বলে ডাকলে সেই অসীম ভালোবাসার দরজা খুলে যায় এবং ভালোবাসার কারণে তিনি আপনার অপরাধ ক্ষমা করে দেন।

৬. আত-তাওয়াব: বান্দার ফেরায় যিনি আনন্দিত হন। আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি বারবার তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭)

এখানে ‘তাওয়াব’ মানে যিনি বান্দার দিকে বারবার ফেরেন। এখানে একটা সূক্ষ্ম দিক আছে। ‘তাওবা’ মানে ফেরা। কিন্তু ‘আত-তাওয়াব’ মানে আল্লাহ নিজেও বান্দার দিকে ফেরেন। বান্দা একহাত এগোলে আল্লাহ দুই হাত এগোন।

এই নাম ধরে ডাকা মানে আল্লাহর সঙ্গে সেই সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখা।

৭. আল-হাই আল-কাইয়ুম: সবকিছুর ওপর যাঁর ক্ষমতা। আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেন, ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বদা বিদ্যমান।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৫)

‘আল-হাই’ মানে চিরঞ্জীব, যিনি কখনো মরেন না, ক্লান্ত হন না, ঘুমান না। ‘আল-কাইয়ুম’ মানে সর্বদা বিদ্যমান, যিনি সবকিছু ধরে রাখেন, সবকিছুর ওপর নজর রাখেন।

এই দুটি নাম মিলিয়ে একটা অসাধারণ বার্তা। তিনি সব সময় জেগে আছেন, সব সময় আপনার দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। রাতের শেষ প্রহরে যখন ডাকছেন, তখনো তিনি আপনাকে দেখছেন। সুতরাং ‘ইয়া হাই ইয়া কাইয়ুম’ বলে তাকে ডাকুন।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর ৯৯টি নাম আছে। যে ব্যক্তি এগুলো আয়ত্ত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩৬)

‘আয়ত্ত করা’ মানে শুধু মুখস্থ নয়, অর্থ বোঝা, তাৎপর্য অনুভব করা এবং সেই অনুযায়ী আল্লাহকে ডাকা।

আজ থেকে দোয়া করার সময় একটু ভাবি—কী চাইছি, কোন নামে ডাকব। রিজিক চাইলে ‘ইয়া রাজ্জাক’। ক্ষমা চাইলে ‘ইয়া গাফফার’। সাহায্য চাইলে ‘ইয়া মুজিব’। ভালোবাসা অনুভব করতে চাইলে ‘ইয়া ওয়াদুদ’। এই নামগুলো শুধুই আল্লাহকে আহ্বানের জন্য নয়, বরং এগুলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ভাষা। যে ভাষায় ডাকলে তিনি কখনো ফিরিয়ে দেন না।

ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নামগুলো জানা এবং সেগুলো দিয়ে ডাকা হলো দোয়ার সবচেয়ে গভীর পথ। কারণ তখন বান্দা শুধু চাইছে না, আল্লাহকে চিনে চাইছে।’ (মাদারিজুস সালিকিন, বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১/৪৫২)

আমরা হাত তুলব। তাঁর নাম ধরে ডাকব। তিনি শুনছেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সুন্দর নামগুলো জানার এবং সেগুলো দিয়ে ডাকার তাওফিক দিন।

মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন