নবীজির দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমানের মানদণ্ড কী

ছবি: এএফপি

জাগতিক মাপকাঠিতে সাধারণত বিপুল বিত্তবৈভব, ক্ষমতা, কূটনৈতিক চাতুর্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চ ডিগ্রির অধিকারীকে সফল ও প্রখর বুদ্ধিমান মনে করা হয়। যে ব্যক্তি পার্থিব স্বার্থ হাসিলে যত বেশি কৌশলী, সমাজ তাকে তত বেশি চতুর বা বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন বলে বাহবা দেয়।

কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শনে দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ইসলামে বুদ্ধি শুধু পার্থিব অর্জনের কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হাতিয়ার নয়; বরং বুদ্ধি হলো সেই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিবেক, যা মানুষকে ক্ষণস্থায়িত্বের মায়া কাটিয়ে চিরন্তন সত্য ও অনন্ত জীবনের প্রস্তুতিতে পরিচালিত করে।

দীর্ঘ আশা ও আত্মপ্রবঞ্চনা

মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘তুলুল আমাল’ বা অবাস্তব দীর্ঘ আশা পোষণ করা। মানুষ প্রতিনিয়ত ভাবে, ‘আমি তো এখনো যুবক, জীবন উপভোগের কত প্রহর সামনে পড়ে আছে; পরিণত বয়সে গিয়ে তওবা করব এবং সৎপথে ফিরে আসব।’

মানুষের আত্মিক ধ্বংসের মূল কারণ দুটি, একটি হলো প্রবৃত্তির দাসত্ব, অপরটি দীর্ঘ আশা; এই দীর্ঘ আশাই মানুষের অন্তর থেকে আখেরাতের ভাবনা মুছে দেয় এবং পার্থিব সম্পদে মোহগ্রস্ত করে রাখে।
ইমাম গাজালি (রহ.)

ইমাম গাজালি উল্লেখ করেছেন, মানুষের আত্মিক ধ্বংসের মূল কারণ দুটি, একটি হলো প্রবৃত্তির দাসত্ব, অপরটি দীর্ঘ আশা; এই দীর্ঘ আশাই মানুষের অন্তর থেকে আখেরাতের ভাবনা মুছে দেয় এবং পার্থিব সম্পদে মোহগ্রস্ত করে রাখে। (আল-গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৪/৪৫৩, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

আরও পড়ুন

দীর্ঘ আশার ক্ষতিকর প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইবনে হাজার আল-আসকালানি লিখেছেন, দীর্ঘ আশা মানুষের ভেতর অলসতা তৈরি করে, তওবাকে পিছিয়ে দেয় এবং পার্থিব মোহে অন্ধ করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহের তাগিদকে স্তব্ধ করে দেয়। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১১/২৩৬, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)

এই অবাস্তব আত্মপ্রবঞ্চনার বিপরীতে রাসুল (সা.) উম্মতকে প্রতিটি মুহূর্ত সচেতন থাকার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘ভোগবিলাসের স্বাদ বিনাশকারী মৃত্যুকে তোমরা প্রতিনিয়ত অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫৮)

প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করা এবং সময়ের মূল্য উপলব্ধি করে ক্ষণস্থায়ী যৌবন ও আয়ুকে পরকালীন মুক্তির কাজে নিয়োজিত করা।

প্রকৃত বুদ্ধিমান ও নির্বোধের রূপরেখা

মৃত্যুর এই অমোঘ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কে প্রকৃত বুদ্ধিমান আর কেই-বা চূড়ান্ত ব্যর্থ—তার এক চিরন্তন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন নবীজি (সা.)। 

তিনি বলেন, ‘প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মাকে বশীভূত করে রাখে (আত্মপর্যালোচনা করে) এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য আমল সঞ্চয় করে। আর প্রকৃত নির্বোধ সে, যে নিজের খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে, অথচ আল্লাহর কাছে অবাস্তব ক্ষমার প্রত্যাশা করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৬০)

আরও পড়ুন

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে রজব আল-হাম্বলি উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের হিসাব নিজেই গ্রহণ করা এবং সময়ের মূল্য উপলব্ধি করে ক্ষণস্থায়ী যৌবন ও আয়ুকে পরকালীন মুক্তির কাজে নিয়োজিত করা; পক্ষান্তরে অসচেতনভাবে পাপের সাগরে নিমজ্জিত থেকে শুধু মুখের কথায় আল্লাহর রহমতের অলীক আশা করা কোনো তাওয়াক্কুল নয়, বরং এটি চরম মূর্খতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা। (ইবনে রজব, জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম, ২/৩৯৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০১)

সন্ধ্যা হলে সকালের আশা কোরো না, আর সকাল হলে সন্ধ্যার জন্য বসে থেকো না। সুস্থতার সময় অসুস্থতার জন্য কিছু সঞ্চয় করো এবং জীবদ্দশায় মৃত্যুর জন্য পাথেয় প্রস্তুত রাখো।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)

মুসাফিরের জীবনবোধ

পার্থিব জীবনের মোহে অন্ধ না হয়ে কীভাবে একজন সচেতন মানুষ তার দিনলিপি পরিচালনা করবে, রাসুল (সা.) সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমরের কাঁধে পরম স্নেহে হাত রেখে সেই দর্শন শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুনিয়াতে এমনভাবে জীবনযাপন করো, যেন তুমি একজন অপরিচিত প্রবাসী অথবা কোনো পরিব্রাজক মুসাফির।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) পরবর্তী সময়ে মানুষকে উপদেশ দিয়ে বলতেন, ‘সন্ধ্যা হলে সকালের আশা কোরো না, আর সকাল হলে সন্ধ্যার জন্য বসে থেকো না। সুস্থতার সময় অসুস্থতার জন্য কিছু সঞ্চয় করো এবং জীবদ্দশায় মৃত্যুর জন্য পাথেয় প্রস্তুত রাখো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১৬)

একজন সচেতন মুসাফির যেমন সরাইখানায় সাময়িক যাত্রাবিরতির সময় সেখানে অট্টালিকা বানানোর মোহে পথ ও গন্তব্য ভুলে যায় না; বরং গন্তব্যে পৌঁছার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বাহন ঠিক রেখেই সন্তুষ্ট থাকে—ঠিক তেমনি মুমিনের কাছেও পার্থিব জগত হলো আখিরাতের পানে এগিয়ে চলার এক ক্ষণস্থায়ী মনজিল।

আরও পড়ুন