আরশ ছোঁয়ার সেই মহিমান্বিত রাত

জেরুজালেমের সোনালী গম্বুজছবি: পেক্সেলস

মানবেতিহাসের পাতায় কিছু ঘটনা কেবল অলৌকিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায় না; বরং তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসী হৃদয়ের পাথেয় এবং সত্য-মিথ্যার এক মহাসন্ধিক্ষণ। বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে ‘ইসরা’ ও ‘মিরাজ’ তেমনি এক মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক পরিক্রমা।

এটি কেবল সময় ও স্থানের সীমানা অতিক্রম করার গল্প নয়; বরং এটি ছিল এক কঠিন পরীক্ষায় নিমজ্জিত নবীকে মহান রবের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ উপহার এবং পরবর্তী এক কঠিন সংগ্রামের জন্য মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি।

দুঃখের রজনী শেষে আশার আলো

ইসরা ও মিরাজের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে নবুয়তের দশম বর্ষে। ইসলামের ইতিহাসে এই বছরটি ‘আমুল হুজন’ বা ‘দুঃখের বছর’ হিসেবে পরিচিত। এ সময়েই আল্লাহর রাসুল তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী ও ইসলামের প্রথম অনুসারী খাদিজা (রা.) এবং তাঁর বিপদে ঢাল হয়ে থাকা চাচা আবু তালিবকে হারান।

চরম এক মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে আকাশভ্রমণে আপ্যায়িত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ যেন জমিনের মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আসমানের রবের পক্ষ থেকে এক বিশেষ সংবর্ধনা।

একদিকে ঘরের শান্তি ও সান্ত্বনার আশ্রয় হারিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে মক্কার কোরাইশদের অসহনীয় জুলুমের সামনে একমাত্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিভাবকহীন হয়ে পড়া—রাসুলের জীবনকে এক কঠিন সংকটে ফেলে দেয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৩৫, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

সান্ত্বনার আশায় তিনি গিয়েছিলেন তায়েফে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে। অতিথিপরায়ণ বলে খ্যাতি আছে তাদের, সুতরাং তারা ইসলামের সমাদর করবে বলে আশা করেছিলেন তিনি; কিন্তু সেখানে চরম অপমানিত ও রক্তাক্ত হন।

এমন চরম এক মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে আকাশভ্রমণে আপ্যায়িত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ যেন জমিনের মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আসমানের রবের পক্ষ থেকে এক বিশেষ সংবর্ধনা।

আরও পড়ুন

ইসরা: মক্কা থেকে জেরুজালেম

‘ইসরা’ শব্দের অর্থ হলো নৈশভ্রমণ। ইসলামের পরিভাষায় মক্কার মসজিদে হারাম থেকে ফিলিস্তিনের মসজিদে আকসা পর্যন্ত সশরীর ভ্রমণের নাম ইসরা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এ ঘটনার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত—যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ১)

এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘বুরাক’ নামক এক বিশেষ বাহনের মাধ্যমে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি ছিল খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড় এক শ্বেতশুভ্র প্রাণী, যার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল চোখের দৃষ্টির শেষ সীমানায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৪)

আল্লাহর রাসুল (সা.) জেরুজালেমে পৌঁছে সেখানে সব নবী ও রাসুলের ইমামতি করেন। এই জামাতটি ছিল এক বিশাল প্রতীকী তাৎপর্যবহ ঘটনা। এর মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয় যে পূর্ববর্তী সব নবীর শরিয়ত ও দাওয়াতের উত্তরাধিকার এখন থেকে মুহাম্মদি উম্মতের কাঁধে অর্পিত হলো।

পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত—যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি।
কোরআন, সুরা ইসরা, আয়াত: ১

মিরাজ: ঊর্ধ্বাকাশ থেকে আল্লাহর আরশ

জেরুজালেম থেকে শুরু হয় মিরাজ বা ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণের পালা। ফেরেশতা জিবরাইলের সাহচর্যে আল্লাহর রাসুল একে একে সাতটি আকাশ অতিক্রম করেন। প্রথম আকাশে আদম, দ্বিতীয় আকাশে ইসা ও ইয়াহইয়া, তৃতীয় আকাশে ইউসুফ, চতুর্থ আকাশে ইদরিস, পঞ্চম আকাশে হারুন, ষষ্ঠ আকাশে মুসা এবং সপ্তম আকাশে নবি ইবরাহিম (আলাইহিমুস সালাম)–এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮৮৭)

এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছান। এটি হলো সৃষ্টিজগতের জ্ঞানের শেষ সীমানা। এর ঊর্ধ্বে আর কোনো সৃষ্টির প্রবেশাধিকার নেই। জিবরাইল (আ.)-ও সেখানে থমকে যান। সেখান থেকে আল্লাহর রাসুল আরশে আজিমের পথে অগ্রসর হন এবং মহান আল্লাহর দর্শন লাভ করেন। এই সুউচ্চ স্তরেই রাসুল তখন আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিস্ময়কর সব নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। (সুরা নাজম, আয়াত: ১৮)

আরও পড়ুন

নামাজ উপহার: মুমিনের মিরাজ

মিরাজের রাতে উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ’। শুরুতে মহান আল্লাহ ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন। এরপর নবী মুসার পরামর্শে আমাদের নবীজি কয়েকবার আল্লাহর কাছে আরজি করে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্তে নিয়ে আসেন। তবে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সংখ্যায় পাঁচ হলেও পুণ্যের পাল্লায় তা ৫০ ওয়াক্তেরই সমান থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৯)

নামাজকে বলা হয় ‘মুমিনের মিরাজ’। রাসুল যেমন মিরাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছিলেন, একজন সাধারণ মুমিনও নামাজের মাধ্যমে সেই আধ্যাত্মিক নৈকট্য অনুভব করতে পারেন। এমনকি সংলাপও হয় তাঁর আল্লাহর সঙ্গে।

তা ছাড়া দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে পাঁচবার আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো আত্মার প্রশান্তির এক অনন্য উৎস। মিরাজের এই উপহার কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি আরশে আজিমে ফরজ হওয়ার কারণেই এর গুরুত্ব অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে অনেক বেশি।

রাসুলের এই সফর ইঙ্গিত দিয়েছিল যে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামের বিজয় কেবল আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা তৎকালীন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের অধীন থাকা ভূখণ্ডগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।

মসজিদে আকসা: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

মিরাজের যাত্রাপথে মসজিদে আকসাকে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল।

  • প্রথমত, এর মাধ্যমে মক্কার মসজিদে হারাম এবং জেরুজালেমের মসজিদে আকসার মধ্যে এক আধ্যাত্মিক সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়েছে।

  • দ্বিতীয়ত, মসজিদে আকসা ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা, নামাজের প্রথম অভিমুখ। মক্কায় থাকাকালীন এবং মদিনায় হিজরতের পরবর্তী ১৬-১৭ মাস মুসলমানরা এই দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯)

রাসুলের এই সফর ইঙ্গিত দিয়েছিল যে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামের বিজয় কেবল আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা তৎকালীন রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের অধীন থাকা ভূখণ্ডগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে। জেরুজালেমের চাবিকাঠি মুসলমানদের হাতে আসবে—এটি ছিল সেই সফরের এক অগ্রিম সুসংবাদ।

পরবর্তী সময়ে হজরত ওমরের খিলাফতকালে যখন জেরুজালেম বিজিত হয়, তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে এই পবিত্র নগরীর চাবি গ্রহণ করেন এবং ‘আহদুন ওমরিয়া’ বা ওমরের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৫৫, দারু হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)

মিরাজ কি সশরীর হয়েছিল

ইসলামের অধিকাংশ আলেম ও গবেষকের মতে, ইসরা ও মিরাজ রাসুলের জাগ্রত অবস্থায় এবং সশরীর সংঘটিত হয়েছিল। কেবল আধ্যাত্মিক বা স্বপ্নযোগে হলে এটি আর কোরাইশদের জন্য কোনো বিস্ময় বা বিতর্কের বিষয় থাকত না।

আল্লাহ–তাআলা কোরআনে ‘বি-আবদিহি’ (তাঁর বান্দাকে নিয়ে) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আরবি ভাষায় ‘আবদ’ বা বান্দা শব্দটির প্রয়োগ দেহ ও আত্মা—উভয়ের সমষ্টির ওপরই হয়ে থাকে। এ ছাড়া এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হজরত আবু বকর (রা.)-এর ‘সিদ্দিক’ উপাধি লাভ এবং কাফেরদের বিরুদ্ধাচরণ প্রমাণ করে যে এটি একটি অলৌকিক শারীরিক ভ্রমণ ছিল। (ইমাম নববি, শারহু মুসলিম, ২/২১০, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৯৪)

ইসরা ও মিরাজের শিক্ষা

এই ঐতিহাসিক সফর থেকে আমরা বেশ কিছু জীবনমুখী শিক্ষা লাভ করি:

১. ধৈর্য ও দৃঢ়তা: তায়েফের অপমান ও স্বজনদের হারানোর পর এই অলৌকিক ভ্রমণ আমাদের শেখায় যে বিপদের শেষেই আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় কোনো বিজয় বা সম্মান অপেক্ষা করে। যারা ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তাদের কখনোই একা ছেড়ে দেন না।

২. আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতা: সফরের শুরুতে রাসুলের বক্ষ বিদীর্ণ করে ‘শাক্কুস সাদর’ বা হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা সম্পন্ন করা হয়েছিল। এটি আমাদের অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব নির্দেশ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২)

৩. বিজ্ঞান ও অলৌকিকতা: আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে আলো ও গতির সীমা নিয়ে কথা বলে, মিরাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্রষ্টার ক্ষমতা বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়। যিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তাঁর জন্য সময় ও স্থানের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেওয়া অতি নগণ্য বিষয়।

৪. জেরুজালেমের পবিত্রতা রক্ষা: মসজিদুল আকসা কেবল একটি সাধারণ মসজিদ নয়; বরং এটি নবীদের আমানত এবং ইসলামের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে থাকা এক পবিত্র স্থান। এর মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব।

ইসরা ও মিরাজ কেবল একটি উৎসব বা ঐতিহাসিক আলোচনার বিষয় নয়। এটি উম্মতের জন্য এক নবচেতনার উৎস। এটি আমাদের নামাজের গুরুত্ব বোঝায়, নবীদের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে এবং জেরুজালেমের সঙ্গে আমাদের আত্মিক সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন