উপহার দেওয়ার আগে মুমিন যে ৫ কথা মনে রাখেন

ছবি: ফ্রিপিক

উপহার মানুষের মনের দূরত্ব ঘোচায়, পারস্পরিক ভালোবাসার সেতুবন্ধ তৈরি করে। প্রিয়জনকে কোনো কিছু উপহার দেওয়া শুধু একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়; ইসলামে এটি নবীজির একটি সুমধুর সুন্নত।

তবে মুমিনের জীবনে যেকোনো কাজই ইবাদত হয়ে ওঠে, যখন তা সঠিক নিয়ম ও পরিশুদ্ধ নিয়তে সম্পন্ন হয়। তাই কাউকে কোনো কিছু উপহার দেওয়ার আগে ইসলামি শিষ্টাচারগুলো মাথায় রাখা জরুরি।

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত

উপহার দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হতে হবে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। উপহার দিয়ে বিনিময়ে অন্য কোনো ফায়দা বা আরও দামি কিছু পাওয়ার আশা করলে তার আত্মিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।

কোরআনে নিঃস্বার্থ দানের প্রশংসায় বলা হয়েছে, ‘তারা বলে, আমরা তো শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার করাই; আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কোনো কৃতজ্ঞতাও নয়।’ (সুরা ইনসান, আয়াত: ৯)

ইমাম গাজালি লিখেছেন, যখন কোনো দাতা শুধু গ্রহীতার ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় নিঃস্বার্থভাবে কিছু দান করেন, তখনই তা প্রকৃত উপহার বা ‘হাদিয়া’ হিসেবে গণ্য হয়; এর বাইরে জাগতিক স্বার্থ মিশে থাকলে তা আর উপহার থাকে না, বরং তা একপ্রকার ঘুষ বা ব্যবসায়িক লেনদেনে পরিণত হয়। (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/১৪৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)

উপহারের ক্ষেত্রে বস্তুর দামের চেয়ে দাতার আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সামান্য বস্তু হলেও তা হাসিমুখে দেওয়া হলে গ্রহীতার অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সমাজের ওপর থেকে লৌকিকতার অহেতুক চাপ কমিয়ে দেয়।
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)
আরও পড়ুন

২. হালাল উপার্জনের ব্যবহার

যাকে উপহার দিচ্ছেন, তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় উপায় হলো হালাল ও পবিত্র উপার্জন থেকে উপহার কেনা। অবৈধ বা সন্দেহযুক্ত টাকায় কেনা দামি উপহারের চেয়ে হালাল পয়সায় কেনা সামান্য উপহার অনেক বেশি বরকতময়।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)

৩. খোঁটা না দেওয়া

উপহার দেওয়ার পর অহংকার করা বা পরে সেই উপকারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে গ্রহীতাকে খোঁটা দেওয়া নিন্দনীয় কাজ। এতে উপহারের সমস্ত সওয়াব ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়।

কোরআনে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ, খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে ওই ব্যক্তির মতো বাতিল কোরো না, যে লোক-দেখানোর জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

আরও পড়ুন
সাহাবি নোমান ইবনে বশিরকে তাঁর পিতা একটি দাস উপহার দিলে মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এমন উপহার দিয়েছ?’

৪. সাধ্যের মধ্যে থাকা

উপহার হতে হবে আন্তরিক। সমাজ বা আত্মীয়স্বজনের চাপে পড়ে, ধারদেনা করে দামি উপহার দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। ছোটখাটো ও সাধ্যের ভেতরের উপহারই সম্প্রীতি বাড়াতে যথেষ্ট।

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহার বিনিময় করো, এতে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪)

উপহারের ক্ষেত্রে বস্তুর দামের চেয়ে দাতার আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সামান্য বস্তু হলেও তা হাসিমুখে দেওয়া হলে গ্রহীতার অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে এবং সমাজের ওপর থেকে লৌকিকতার অহেতুক চাপ কমিয়ে দেয়। (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ৫/২১০, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

৫. সন্তানদের ক্ষেত্রে সমতা

পরিবারে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো সন্তানদের মধ্যে সমতা বজায় রাখা। একজনকে বেশি ভালোবেসে দামি উপহার দেওয়া আর অন্যজনকে বঞ্চিত করা ইসলামি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

সাহাবি নোমান ইবনে বশিরকে তাঁর পিতা একটি দাস উপহার দিলে মহানবী (সা.) তা অনুমোদন করেননি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এমন উপহার দিয়েছ?’ পিতা ‘না’ উত্তর দিলে নবীজি বলেন, ‘তাহলে আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭)

উপহার শুধু বস্তুগত আদান-প্রদান নয়, এটি দুটি হৃদয়ের মেলবন্ধন। শুদ্ধ নিয়ত, হালাল উপার্জন ও আন্তরিকতার সংমিশ্রণে দেওয়া একটি ছোট উপহারও মুমিনের আমলনামায় বিশাল পুণ্যের কারণ হতে পারে, যা ইহকাল ও পরকালে প্রশান্তি বয়ে আনে।

আরও পড়ুন