মাগরিবের আজান হতে তখনও কিছুক্ষণ বাকি। কাসাব্লাঙ্কা কিংবা রাবাতের সরু গলিগুলোতে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। চারদিকে ভাজা মিষ্টি আর মশলাদার স্যুপের ম ম ঘ্রাণ। আটপৌরে দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্তোরাঁ—সবখানেই ব্যস্ততা
মরক্কোর মানুষের কাছে রমজান মানে এক দীর্ঘ সামাজিক উৎসব, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত সাজানো থাকে হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যের কারুকাজে।
উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত জুড়ে রয়েছে সুবিস্তৃত আটলান্টিক মহাসাগর। এছাড়া এর উত্তর দিকে ভূমধ্যসাগর রয়েছে, যা একে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগর—উভয় উপকূলে অবস্থিত একটি অনন্য দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে।
হারিরা: মরক্কোর ইফতারের প্রাণ
মরক্কোর ইফতার টেবিলের কথা উঠলেই সবার আগে আসে ‘হারিরা’র নাম। এটি মরক্কোর ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টমেটো, ডাল, ছোলা আর বিশেষ মশলার মিশ্রণে তৈরি এই ঘন স্যুপটি সারাদিনের রোজার পর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়।
হারিরার সঙ্গে পাতে থাকে ‘শুবাকিয়া’—তিল আর মধু দিয়ে তৈরি এক ধরনের বিশেষ ভাজা মিষ্টি, যা দেখতে অনেকটা গোলাপ ফুলের মতো। লবণাক্ত হারিরার সঙ্গে মিষ্টি শুবাকিয়ার এই যুগলবন্দি মরক্কোর ইফতারকে বিশ্বের অন্য সব দেশের থেকে আলাদা করে দেয়।
দস্তরখানের আরো বৈচিত্র্য
মরক্কোর ইফতার দস্তরখান অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। হারিরা ও শুবাকিয়ার পাশাপাশি সেখানে থাকে:
সেল্লো: ভাজা তিল, বাদাম আর আটা দিয়ে তৈরি এক ধরনের পুষ্টিকর মিষ্টান্ন।
বগ্রির ও মসেম্মেন: মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী প্যানকেক ও পরোটা, যা মাখন ও মধু দিয়ে খাওয়া হয়।
তাজা ফলের রস: মরক্কোতে ইফতারে প্রচুর পরিমাণে অ্যাভোকাডো শেক কিংবা কমলার রস পানের চল রয়েছে।
তবে আধুনিক যুগে মরক্কোর তরুণ প্রজন্ম ইফতারে বিভিন্ন ধরনের সালাদ, গ্রিল করা মাছ এবং আধুনিক পেস্ট্রিও পছন্দ করছে। ইউটিউবের জনপ্রিয় রাঁধুনি হালিমা ফিলালি কিংবা শমিশার রেসিপি দেখে নতুন নতুন পদ রান্নার এক প্রতিযোগিতা চলে ঘরে ঘরে।
‘তাকাসুল’: সহমর্মিতার উৎসব
রমজানে পাড়ায় পাড়ায় গণ-ইফতারের আয়োজন করা হয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পথচারী ও অভাবী মানুষের জন্য সাজিয়ে রাখা হয় ইফতারের বাক্স। একে বলা হয় ‘তাকাসুল’।
এমনকি এই সংহতি কখনো কখনো সীমান্তও ছাড়িয়ে যায়। সম্প্রতি মরক্কো-আলজেরিয়া সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে দুই দেশের মানুষের একত্রে ইফতার করার এক আবেগঘন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
মরক্কো ও আলজেরিয়ার রাজনৈতিক সীমান্ত ১৯৯৪ সাল থেকে বন্ধ। ভিডিওতে দেখা যায়, মরক্কোর আহফির শহর আর আলজেরিয়ার বুকানন গ্রামের মানুষ সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে বসে ঠিক একই সময়ে ইফতার করছেন। জাকারিয়া নামের এক যুবক, যার পরিবার দুই দেশে বিভক্ত, তিনি এই ‘সীমান্ত ইফতার’-এর আয়োজন করেন।
পোশাকের ঐতিহ্য
মরক্কোতে রমজানে ইফতারের পর নারী ও পুরুষ একযোগে তারাবির নামাজের জন্য মসজিদের দিকে রওনা হন। প্রায় সবার গায়েই থাকে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘জেলাবা’। এটি একটি ঢিলেঢালা লম্বা আলখাল্লা যার মাথায় একটি টুপি যুক্ত থাকে।
ক্যাসাব্লাঙ্কার সুবিশাল ‘হাসান–২ মসজিদ’ কিংবা রাবাতের ‘হাসান মসজিদ’-এ যখন হাজার হাজার মানুষ তাদের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজে দাঁড়ান, তখন এক অপার্থিব দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নাফফার: ম্লান হওয়া ঐতিহ্য
পুরনো শহরগুলোর গলিতে সাহ্রি জাগানোর জন্য এখনও দেখা মেলে ‘নাফফার’-এর। নাফফার হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সাহ্রির সময় লম্বা এক ধরনের বাঁশি বাজিয়ে বা ঢোল পিটিয়ে মানুষকে ঘুম থেকে জাগান।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অ্যালার্ম ঘড়ি থাকলেও মরক্কোর মানুষ তাদের এই শেকড়কে ভুলতে চায় না। ফেজ বা মারাকেশের মতো মরক্কোর প্রাচীন শহরগুলোতে আজও টিকে আছে ‘নাফফার’ ঐতিহ্য। তরুণরা এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচারণাও চালায়।
বন্যার বিপর্যয়
তবে বন্যার কারণে অনেক এলাকায় এবারের রমজানের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। কেনিত্রার শরণার্থী শিবিরের আশ্রয় নিয়েছেন বহু মানুষ। বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে তাদের তাঁবুতে বসে ইফতার করতে হচ্ছে।
এমন কষ্টের মাঝেও তারা মোমবাতি জ্বালিয়ে হারিরা আর শুকনো রুটি দিয়েই খুঁজে নিচ্ছেন রমজানের তৃপ্তি।