ইসলাম মানুষের বাহ্যিক ইবাদতের চেয়েও অন্তরের পবিত্রতা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরিচ্ছন্নতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
আমরা অনেকেই মনে করি, রোজা মানে কেবল দিনের বেলা পানাহার থেকে বিরত থাকা। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ রোজা হলো—শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বাঁচিয়ে রাখা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর অঙ্গ হলো আমাদের ‘চোখ’।
দৃষ্টির আমানত
আল্লাহ–তাআলা মানুষকে চোখ দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টিজগত দেখে শিক্ষা নিতে এবং সত্যকে চিনতে। কিন্তু এই চোখের মাধ্যমেই মানুষ সবচেয়ে বেশি বিচ্যুত হয়।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনই চোখের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। অপ্রয়োজনীয় ব্রাউজিং আমাদের মূল্যবান সময় যেমন নষ্ট করছে, তেমনি অবচেতন মনে আমাদের দৃষ্টিকে হারামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন, “মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
লক্ষ্যণীয় যে আল্লাহ লজ্জাস্থান রক্ষার আগে দৃষ্টি সংযত করার কথা বলেছেন। কারণ, চোখের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই মানুষকে বড় বড় পাপাচারের দিকে টেনে নেয়।
আল্লাহ আরও সতর্ক করেছেন, “নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৬)
চোখের বহুমুখী পাপাচার
দৃষ্টির পাপাচারের পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত। বিশেষ করে বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা চোখের মাধ্যমে নানাভাবে পাপে লিপ্ত হচ্ছি:
অন্যের দোষ অন্বেষণ করা: ডিজিটাল প্লাটফর্মে বা বাস্তব জীবনে মানুষের ব্যক্তিগত ভুলত্রুটি বা দুর্বলতা খুঁজে বের করা চোখের একটি বড় পাপ। অথচ হাদিসে অন্যের দোষ গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হিংসা ও লোভের দৃষ্টি: অন্যের সম্পদ, লাইফস্টাইল বা সফলতা দেখে হিংসার চোখে তাকানো বা নিজের যা নেই তা নিয়ে হাহুতাশ করা অন্তরের শান্তি নষ্ট করে।
মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট: অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা ভুয়া খবর, অন্যের সম্মানহানি করে এমন ভিডিও বা জঘন্য কোনো দৃশ্য দেখা—যা মানুষের রুচি ও ইমানকে কলুষিত করে।
অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের নিকটবর্তী হওয়া: আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩২)
এই ‘কাছে যাওয়া’র প্রধান মাধ্যম হলো চোখ। কোনো অশ্লীল দৃশ্য বা হারামের প্রতি প্রলুব্ধ হওয়া মানেই নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।
নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রতিটি অঙ্গের মাধ্যমে ‘জিনা’ (ব্যভিচার) সংঘটিত হতে পারে, আর চোখের জিনা হলো হারাম দৃষ্টি...।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২৪৩)
এখানে দৃষ্টি বলতে কেবল সরাসরি ব্যভিচার নয়, বরং যেকোনো হারামের প্রতি প্রলুব্ধ হওয়াকেও বোঝানো হয়েছে।
ডিজিটাল স্ক্রিনে চোখের পাহারাদার
বর্তমান যুগে আমাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিনই হলো চোখের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। অপ্রয়োজনীয় ব্রাউজিং আমাদের মূল্যবান সময় যেমন নষ্ট করছে, তেমনি অবচেতন মনে আমাদের দৃষ্টিকে হারামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এই ডিজিটাল পাপাচার থেকে বাঁচতে আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন কাহাফ ব্রাউজারের (Kahf Browser) মতো টুল ব্যবহার করা।
অনেক সময় আমরা না চাইলেও অনলাইনে অনুপযুক্ত ছবি বা ভিডিও সামনে চলে আসে। এই ব্রাউজারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেসব অশ্লীল বা অপ্রয়োজনীয় দৃশ্য ঝাপসা (ব্লার) করে দেয়। এতে অনিচ্ছাকৃত পাপ থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়।
আমাদের চোখ যেন অন্যের গীবত না খোঁজে, অন্যের সম্পদে লোভাতুর না হয় এবং কোনো অশ্লীল বা অহেতুক কন্টেন্টে লিপ্ত না হয়।
রমজান হোক ‘চোখের রোজা’র মাস
রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আত্মসংযম অর্জন করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও পাপাচার (যা চোখের মাধ্যমেও হতে পারে) ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৩)
তাই এবারের রমজানে আমাদের শপথ হোক—আমরা শুধু পেটের রোজা রাখব না, চোখের রোজাও রাখব। আমাদের চোখ যেন অন্যের গীবত না খোঁজে, অন্যের সম্পদে লোভাতুর না হয় এবং কোনো অশ্লীল বা অহেতুক কন্টেন্টে লিপ্ত না হয়।
চোখের আমানত রক্ষা করতে পারলেই আমাদের রোজা হবে সার্থক।
মিরাজ রহমান: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক