সমাজে একে অপরের প্রশংসা করা একটি সাধারণ সৌজন্য। তবে এই প্রশংসা যখন অতিশয়োক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা প্রশংসিত ব্যক্তির জন্য কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি বয়ে আনে।
মহানবী (সা.) মানুষের সামনে অতিরিক্ত প্রশংসা বা চাটুকারিতার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি একে ‘গলা কেটে ফেলা’ বা ‘পিঠ ভেঙে দেওয়া’র মতো মারাত্মক বিষয়ের সাথে তুলনা করেছেন।
‘তুমি তো তোমার ভাইয়ের ঘাড় কেটে দিলে’
হাদিসে এসেছে, একবার এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর সামনে অন্য এক ব্যক্তির খুব প্রশংসা করলেন। তখন মহানবী (সা.) তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দুর্ভোগ তোমার, তুমি তো তোমার ভাইয়ের ঘাড় কেটে দিলে।’
তিনি কথাটি বারবার বললেন। এরপর তিনি একটি সুন্দর পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। বললেন, যদি তোমাদের কাউকে কারো প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে—‘আমি তাকে এমন মনে করি, আর আল্লাহই তার প্রকৃত হিসাব গ্রহণকারী। আল্লাহর ওপর আমি কাউকে পবিত্র ঘোষণা করি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৬২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০০)
যখন তোমরা চাটুকার বা অতি-প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি ছুড়ে মারো।
ইমাম ইবনে বাত্তাল (র.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, প্রশংসার আতিশয্যে মানুষ অনেক সময় আত্মতৃপ্তিতে ভোগে। ফলে সে নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবতে শুরু করে এবং ইবাদত বা ভালো কাজে অলস হয়ে পড়ে। এতে তার আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে।
চাটুকারদের মুখে ধুলো দেওয়া
চাটুকারিতা বা মিথ্যা প্রশংসা ইসলামে চরমভাবে নিন্দিত। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা চাটুকার বা অতি-প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি ছুড়ে মারো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০২)
সাহাবি মিকদাদ (রা.) একবার ওসমান (রা.)-এর সামনে এক চাটুকারকে প্রশংসা করতে দেখে এই হাদিসটির ওপর আমল করেছিলেন।
আলেমরা এই ‘মাটি ছুড়ে দেওয়া’র কয়েক ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন এটি আক্ষরিক অর্থেই মাটি দেওয়া, আবার কেউ বলেছেন এর অর্থ হলো তাদের কোনো পুরস্কার বা দান না দিয়ে বঞ্চিত করা। কারণ চাটুকাররা মূলত জাগতিক লাভের জন্যই এমনটি করে থাকে।
কখন প্রশংসা করা জায়েজ
সব প্রশংসাই কি নিষিদ্ধ? না, বিষয়টি তেমন নয়। নবীজি (সা.) নিজেও অনেক সাহাবির প্রশংসা করেছেন। যেমন তিনি আবু বকর (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নও (যারা অহংকার করে কাপড় ঝুলায়)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬২)।
পণ্ডিতদের মতে, প্রশংসা তখনই জায়েজ যখন: ১. প্রশংসাটি সম্পূর্ণ সত্য হয়। ২. প্রশংসিত ব্যক্তির মধ্যে অহংকার বা আত্মগরিমা তৈরি হওয়ার ভয় না থাকে। ৩. প্রশংসার মাধ্যমে তাকে ভালো কাজে আরও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্য থাকে।
প্রশংসিত ব্যক্তির করণীয়
যদি কেউ আপনার সামনে আপনার প্রশংসা করে, তবে সালফে সালেহিন বা পূর্বসূরি আলেমদের শেখানো একটি দোয়া পড়া উচিত।
তারা বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তারা আমার সম্পর্কে যা জানে না, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করুন; তারা যা বলছে সে বিষয়ে আমাকে পাকড়াও করবেন না এবং তারা আমাকে যতটা ভালো মনে করছে, আমাকে তার চেয়েও উত্তম করে দিন।’ (বায়হাকি, শুআবুল ইমান, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২২৮)
শেষ কথা
সামনাসামনি প্রশংসা, তোষামোদি বা চাটুকারিতা কেবল ব্যক্তির জন্য নয়, সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের চারপাশে যারা সবসময় প্রশংসার ডালি নিয়ে বসে থাকে, তারা মূলত ওই ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো—আমরা যেন মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দেই, কিন্তু প্রশংসা করতে গিয়ে তাকে মিথ্যার বা অহংকারের জালে আটকে না ফেলি। পরিমিত বোধ ও সত্যনিষ্ঠাই হোক আমাদের আচরণের মূল ভিত্তি।