মহান আল্লাহর সঙ্গে বান্দার ‘আদব’ কেমন হওয়া উচিত—তা আমরা খুব কমই ভাবি। সম্মানিত কারও সঙ্গে কথা বলার সময় আমরা সচেতনভাবে শব্দ চয়ন করি। অথচ মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর সামনে আমাদের সেই সচেতনতা কোথায়?
অনেকের ধারণা, আল্লাহর সঙ্গে আদব রক্ষা করার অর্থ কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত যেমন নামাজ পড়া কিংবা সুনির্দিষ্ট কিছু পাপ থেকে বেঁচে থাকা। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে বান্দার অসদাচরণ কি কেবল দৃশ্যমান পাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
ইসলাম শেখায় কীভাবে নিজের প্রতিপালকের সামনে বিনম্র চিত্তে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে তাঁর বাণীকে পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করতে হয় এবং সব অবস্থায় কীভাবে একটি অনুগত হৃদয় নিয়ে তাঁর দিকে রুজু হতে হয়।
আল্লাহর সঙ্গে আদব রক্ষার ১০ দিক আলোচনা করা হলো:
বাহ্যিকভাবে দুজন মানুষ একই কাজ করতে পারেন, কিন্তু নিয়তের পার্থক্যের কারণে আল্লাহর কাছে তাঁদের মর্যাদা বদলে যেতে পারে।
১. তাওহিদ বাস্তবায়ন করা
আল্লাহর সঙ্গে বান্দার প্রধান আদব হলো, ইবাদতের প্রতিটি রূপ শুধু এবং একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করা।
কারণ, আল্লাহ নিজের সঙ্গে কাউকে অংশীদার করা পছন্দ করেন না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা চরম জুলুম।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৩)
যে মর্যাদা শুধু আল্লাহরই প্রাপ্য, একজন বান্দা যখন অন্য কাউকে সেই মর্যাদা দেয় না, তখনই তাওহিদের প্রকৃত সম্মান রক্ষা পায়।
২. ইখলাসভিত্তিক জীবনযাপন
বান্দার প্রতিটি কথা, কাজ ও নিয়তের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হবেন আল্লাহ। অর্থাৎ প্রতিটি কাজ লোকদেখানো উদ্দেশ্যমুক্ত হয়ে শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। বাহ্যিকভাবে দুজন মানুষ একই কাজ করতে পারেন, কিন্তু নিয়তের পার্থক্যের কারণে আল্লাহর কাছে তাঁদের মর্যাদা বদলে যেতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর ও অবয়বের দিকে তাকান না, বরং তিনি তাকান তোমাদের হৃদয়ের (নিয়ত) দিকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
৩. আল্লাহকে সত্যিকারের ভালোবাসা
সত্যিকারের ভালোবাসার মাপকাঠি হলো, আল্লাহ যা ভালোবাসেন, তা মনেপ্রাণে গ্রহণ করা এবং তিনি যা অপছন্দ করেন, তা বর্জন করা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ৩১)
৪. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
শুধু মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম কৃতজ্ঞতা নয়, বরং প্রাপ্ত নেয়ামতকে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে ব্যবহার না করাই আসল কৃতজ্ঞতা।
আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
মুমিনের বিষয়টি কত চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই কল্যাণকর...যদি তার ওপর কোনো মুসিবত আসে এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তবে তা-ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।
৫. আল্লাহর সীমারেখার সম্মান করা
ইসলামের বিধান নিয়ে কোনো ধরনের ঠাট্টাবিদ্রূপ না করা এবং ধর্মীয় প্রতীকগুলোর সম্মান করা মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য।
কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলিকে সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়ারই বহিঃপ্রকাশ।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩২)
৬. কোরআন–সুন্নাহর আনুগত্য
যেখানে কোরআন–সুন্নাহর সিদ্ধান্ত স্পষ্ট, সেখানে কোনো দ্বিধা না রেখে মেনে চলাই অনুগত বান্দার শিষ্টাচার।
আল্লাহ বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর এই অধিকার নেই যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ের ফয়সালা করার পর তারা সেই বিষয়ে নিজেদের অন্য কোনো সিদ্ধান্তের ইখতিয়ার রাখে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৩৬)
৭. আন্তরিক তওবা করা
পাপের পর লজ্জিত হয়ে অবিলম্বে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই বান্দার আদব। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পাপ থেকে অনুতপ্ত হয়ে তাওবাকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো পাপই নেই।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫০)
৮. আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয়
মুমিন আল্লাহর রহমতের প্রতি তীব্র আশা রাখার পাশাপাশি তাঁর আজাবকে মনেপ্রাণে ভয় করে। এই আশা ও ভয়ের ভারসাম্য বান্দাকে আল্লাহর সামনে সব সময় বিনয়ী ও অহংকারমুক্ত রাখে।
আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের গুণাবলিতে বলেছেন, ‘তারা আশা ও ভয় নিয়ে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৯০)
আল্লাহর সঙ্গে আদব রক্ষা করা কোনো কৃত্রিম আচরণের নাম নয়; এটি মূলত একটি বিনীত, সমর্পিত ও কৃতজ্ঞ হৃদয়ের সামগ্রিক প্রতিফলন।
৯. তকদিরে বিশ্বাস রাখা
বান্দার আদব হলো এটি বিশ্বাস করা যে আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে কল্যাণ লুকায়িত আছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি কত চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই কল্যাণকর...যদি তার ওপর কোনো মুসিবত আসে এবং সে ধৈর্য ধারণ করে, তবে তা-ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
১০. আল্লাহর নামে ইমান আনা
মুমিন যখন বিশ্বাস করে আল্লাহ ‘আস-সামি’ (সর্বশ্রোতা) ও ‘আল-বাসির’ (সর্বদ্রষ্টা), তখন সে একাকী নির্জনেও কোনো পাপ করতে লজ্জা ও ভয় পায়।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর রয়েছে চমৎকার সব নাম, অতএব তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮০)
আল্লাহর সঙ্গে আদব রক্ষা করা কোনো কৃত্রিম আচরণের নাম নয়; এটি মূলত একটি বিনীত, সমর্পিত ও কৃতজ্ঞ হৃদয়ের সামগ্রিক প্রতিফলন। আল্লাহর সঙ্গে আদব রক্ষার অর্থ হলো, আমাদের হৃদয়ের ক্যানভাসে আল্লাহর ভালোবাসাকে দুনিয়ার সবকিছুর ওপরে স্থান দেওয়া।
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক