আমাদের দৈনন্দিন আড্ডার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরনিন্দা বা গিবত। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার কমেন্ট বক্স—অন্যের সমালোচনা করাকে আমরা বিনোদনের অংশ বানিয়ে ফেলেছি।
অথচ এই অভ্যাসটি শুধু মানুষের সম্মানই নষ্ট করে না, বরং সামাজিক শান্তি ও সংহতিকেও ধ্বংস করে দেয়। একে অপরের প্রতি ঘৃণা ও অবিশ্বাস তৈরির এই বিষবাষ্প থেকে বাঁচতে ইসলামের ১০টি বৈপ্লবিক সূত্র তুলে ধরা হলো:
১. পরনিন্দার সংজ্ঞা বোঝা
কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো কথা বলা যা সে জানলে কষ্ট পাবে, তা-ই গিবত। এমনকি সেই দোষটি যদি তার মধ্যে সত্যিই বিদ্যমান থাকে, তবুও তা বলা ইসলামে নিষিদ্ধ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “গিবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)
২. পরচর্চাকে ঘৃণা করা
পরনিন্দাকে ইসলামে কতটা জঘন্য মনে করা হয়েছে, তা বোঝা যায় পবিত্র কোরআনের এই একটি রূপক বর্ণনা থেকে। এটি কোনো সাধারণ ভুল নয়, বরং চরম অমানবিক কাজ।
আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দই করো।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১২)
৩. আত্মশুদ্ধিতে মনোযোগ
সাফল্যের একটি বড় সূত্র হলো অন্যের দোষ খোঁজার বদলে নিজের ভুলগুলো সংশোধন করা। সফল মানুষরা অন্যের সমালোচনা না করে নিজের উন্নতিতে সময় ব্যয় করেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ, যার নিজের ত্রুটি-বিচ্যুতি তাকে অন্যের ত্রুটি অন্বেষণ থেকে বিরত রাখে।” (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, হাদিস: ১৭৫৭৬)
৪. কুৎসা রটনাকারীকে প্রশ্রয় না দেওয়া
যে ব্যক্তি আপনার কাছে অন্যের নামে নিন্দা করছে, সে নিশ্চিতভাবেই অন্যের কাছে আপনার নিন্দাও করবে। তাই পরনিন্দাকারীকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে হলো সামাজিক ফিতনাকে উসকে দেওয়া।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “চোগলখোর (কুৎসা রটনাকারী) জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৬)
৫. জিহ্বার ওপর নিয়ন্ত্রণ
আমাদের কথার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি পাপ ও অশান্তি ছড়ায়। মৌখিক সংযম বা ‘মৌনতা’ অনেক সময় বড় ধরনের সামাজিক বিবাদ থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দেয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের ওপর ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৫)
৬. অন্যের দোষ গোপন রাখা
কারো ত্রুটি মানুষের সামনে প্রচার না করে তা গোপন রাখা এবং তাকে একান্তে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দেওয়া একটি মহৎ গুণ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
৭. সত্যতা যাচাই করা
সামাজিক ফিতনার বড় কারণ হলো না জেনে কথা ছড়ানো। ফেসবুক বা লোকমুখে কোনো তথ্য পেলেই তা যাচাই না করে শেয়ার করা সরাসরি পাপ।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫)
৮. মজলিসের কাফফারা আদায়
যদি অসাবধানতাবশত কোনো আড্ডায় গিবত হয়ে যায়, তবে সেই মজলিস শেষ হওয়ার আগে ক্ষমা প্রার্থনা করা জরুরি। হাদিসে ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা…’ পড়ার কথা এসেছে। এটি মানসিক সচেতনতা বাড়ায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৩৩)
৯. মানুষের সম্মানকে পবিত্র মনে করা
প্রত্যেকটি মানুষের মান-সম্মান তার রক্ত ও সম্পদের মতোই পবিত্র। কারো সম্মানে আঘাত করা মানে তার অস্তিত্বে আঘাত করা।
বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য পবিত্র।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭)
১০. ইতিবাচক আলোচনার চর্চা
আড্ডায় নেতিবাচক কথা বা কারো সমালোচনা না করে গঠনমূলক আলোচনা, জ্ঞানচর্চা বা সমাজসেবার পরিকল্পনা করলে অন্তরে প্রশান্তি আসে।
আল্লাহ বলেছেন, “তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই; কিন্তু কল্যাণ আছে যে দান-খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নির্দেশ দেয়।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১১৪)
শেষ কথা
পরনিন্দা বা গিবত মুক্ত সমাজ মানেই হলো ভালোবাসার সমাজ। আমরা যদি অন্যের ত্রুটি না খুঁজে নিজেরা পরিশুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করি, তবে সামাজিক ফিতনা কমে আসবে এবং পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পাবে।