কীভাবে কোরআন পড়লে জীবন বদলে যাবে

আমাদের পাঠ কি কেবল অক্ষরের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ, নাকি তা আমাদের হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করছে?ছবি: পেক্সেলস

আমরা অনেকেই কোরআন পড়ি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—ঠিক কীভাবে পড়ছি? আমাদের পাঠ কি কেবল অক্ষরের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ, নাকি তা আমাদের হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করছে?

কোরআন পাঠের সঠিক পদ্ধতি এবং এর অন্তর্নিহিত হিদায়াত অনুধাবন করাই হলো দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার মূল চাবিকাঠি।

কোরআন পাঠে পাঠকের নিয়ত

সমাজে কোরআন পাঠকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হতে দেখা যায়। কেউ শুধু তাজবিদ বা বিশুদ্ধ উচ্চারণের দিকে নজর দেন, কেউ বেশি বেশি খতম দিয়ে সওয়াব অর্জনে সচেষ্ট থাকেন, আবার কেউ কোরআনকে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেন।

প্রকৃত পাঠক তিনিই, যাঁর অন্তর কোরআনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে, জীবনের প্রতিটি সংকটে বা মুহূর্তে তাঁর মস্তিষ্কে একটি আয়াত ভেসে ওঠে—যা সেই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেয় এবং সমাধানের পথ দেখায়। কোরআনের এই জীবন্ত উপস্থিতিই একজন মুমিনকে ‘আহলুল্লাহ’ বা আল্লাহর খাস বান্দায় পরিণত করে।

একটি নিথর দেহে প্রাণ সঞ্চার হলে যেমন তা সচল হয়ে ওঠে, তেমনি কোরআনের এই রুহ যখন একজন গাফেল বা বিচ্যুত মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন সে নতুন জীবন লাভ করে।

যেভাবে কোরআন পড়লে জীবন বদলাবে

১. কোরআনকে ধরুন ‘রুহ’ হিসেবে: আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর কিতাবকে ‘রুহ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, “এভাবেই আমি আপনার প্রতি আমার পক্ষ থেকে রুহ (অহি) পাঠিয়েছি।” (সুরা শুরা, আয়াত: ৫২)

একটি নিথর দেহে প্রাণ সঞ্চার হলে যেমন তা সচল হয়ে ওঠে, তেমনি কোরআনের এই রুহ যখন একজন গাফেল বা বিচ্যুত মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন সে নতুন জীবন লাভ করে।

রুহের ছোঁয়া পেতে হলে অন্তরের পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন। জনৈক সাহাবি যখন আল্লাহর রাসুলের কাছে সুরা জিলজালের আয়াত শুনলেন. “যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখবে, আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করবে সেও তা দেখবে” (আয়াত: ৭-৮); তখন তিনি বললেন, “আমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট!” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৯৯)

অর্থাৎ, এই সামান্য কয়টি শব্দই তাঁর জীবনের মানদণ্ড বদলে দিয়েছিল। কোরআনের প্রতিটি শব্দই এমন শক্তিশালী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

আরও পড়ুন

২. কোরআন হোক আত্মার খোরাক: শরীরের পুষ্টির জন্য যেমন সুষম খাদ্যের প্রয়োজন, আত্মার বেঁচে থাকার জন্যও প্রয়োজন নিয়মিত খোরাক। আর আত্মার শ্রেষ্ঠ খাদ্য আল্লাহর কালাম। আমরা যখন কোরআন পাঠ কমিয়ে দিই, তখন আমাদের আত্মা অপুষ্টিতে ভোগে; যার ফলে জীবনে নেমে আসে অশান্তি, অস্থিরতা ও সংকীর্ণতা।

নিয়মিত কোরআন পাঠ আত্মার সেই ঘাটতি পূরণ করে মনে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনে।

৩. দাসত্বের আবহে কোরআন পাঠ: কোরআন পাঠের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দুয়ার হলো ‘উবুদিয়্যাহ’ বা দাসত্ব। নিজেকে আল্লাহর একজন নগন্য দাস মনে করে যখন কেউ কোরআন পড়ে, তখন সে প্রতিটি হরফে মনোযোগী হয়।

কারণ সে জানে এটি তার মালিকের পক্ষ থেকে আসা নির্দেশ। একজন অনুগত ভৃত্য যেমন তার প্রভুর নির্দেশের অপেক্ষায় কান খাড়া করে থাকে, মুমিনও তেমনি কোরআনের আদেশ-নিষেধ ও দিকনির্দেশনা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তা পালনে সচেষ্ট হয়। এই আনুগত্যই মানুষের মাঝে হক ও বাতিলের পার্থক্য করার শক্তি বা ‘বাসিরাত’ তৈরি করে।

৪. সর্বোচ্চ জ্ঞান ও পরিচয়ের উৎস: কোরআন হলো মহান আল্লাহকে জানার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। আল্লাহর গুণাবলি, তাঁর মহিমা এবং সৃজনশীলতা বুঝতে হলে কোরআনের আয়াতগুলোর বিকল্প নেই। যেমন সুরা হাশরে আল্লাহর সুমহান নামসমূহ ও গুণাবলির বর্ণনা (আয়াত: ২২-২৪)।

যখন আমরা অনুধাবন করি যে, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু নিজ নিজ ভাষায় আল্লাহর তসবি পাঠ করছে (সুরা ইসরা, আয়াত: ৪৪), তখন আমরাও সেই মহাজাগতিক ইবাদতের স্রোতে শামিল হই।

৫. জীবনযুদ্ধের রসদ কোরআন: কোরআন আমাদের সামনে সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংঘাতের চিত্র তুলে ধরে। নবী-রাসুল ও মুমিনদের ত্যাগ, ধৈর্য এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্যের কাহিনীগুলো আমাদের মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অভয় দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)

আরও পড়ুন

এই বিশ্বাস আমাদের বিপদে ভেঙে পড়তে দেয় না। বাতেল শক্তি যখন মুমিনের ইমান কেড়ে নিতে চায় বা হৃদয়ে সংশয় তৈরি করতে চায়, তখন কোরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, “তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই…” (সুরা তওবা, আয়াত: ৩২)

কোরআন কেবল রমজান মাসে বা বিপদে পড়ার সময় পড়ার বস্তু নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের পাথেয়। আমাদের উচিত আজ থেকেই কোরআন পাঠের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করা।

যে উদ্দেশ্যে কোরআন পাঠ করব

দুনিয়ার স্বরূপ চেনা: কোরআন আমাদের শেখায় যে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস অতি সামান্য (সুরা নিসা, আয়াত: ৭৭)। তাই এখানে কিছু হারিয়ে গেলে মুমিন বিচলিত হয় না, বরং সে আখিরাতের স্থায়ী কল্যাণের আশা রাখে।

আল্লাহর চিরায়ত সুন্নাহ অনুধাবন: সমাজ ও জাতির উত্থান-পতনের পেছনে আল্লাহর কিছু অমোঘ নিয়ম রয়েছে যা কখনো পরিবর্তন হয় না (সুরা আহজাব, আয়াত: ৬২)। এর মধ্যে অন্যতম হলো, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সুরা রাদ, আয়াত: ১১)

স্বভাবজাত পবিত্রতায় ফেরা: শয়তান প্রতিনিয়ত মানুষের স্বভাবজাত পবিত্রতা নষ্ট করতে চায়। কোরআন পাঠ আমাদের সেই ফিতরাতের ওপর অটল রাখে। আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীল বান্দাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৯৬)। এই নিশ্চয়তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত করে এবং হালাল উপার্জনে উৎসাহিত করে।

কোরআন কেবল রমজান মাসে বা বিপদে পড়ার সময় পড়ার বস্তু নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের পাথেয়। আমাদের উচিত আজ থেকেই কোরআন পাঠের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করা। অর্থ বুঝে, মনোযোগ দিয়ে এবং আমলের নিয়তে কোরআন পড়লে তা আমাদের অন্তরে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনবে।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলতেন, “যে ব্যক্তি কোরআনের হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জীবন সংকীর্ণ হয়ে যায়।” (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১৩/২১০, দারুল ওয়াফা, ২০০৫)

আরও পড়ুন