কোরআনে বর্ণিত ‘অগ্রগামী দল’ কোনটি

ছবি: পেক্সেলস

পরকালের অন্তহীন যাত্রায় মানুষের শেষ গন্তব্য কী হবে, তা নিয়ে পবিত্র কোরআনের সুরা ওয়াকিআয় এক চিরন্তন ও বিশদ মানচিত্র এঁকে দেওয়া হয়েছে। সেখানে হাশরের ময়দানে উপস্থিত সমগ্র মানবজাতিকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, “এবং তোমরা বিভক্ত হয়ে পড়বে তিন শ্রেণিতে। যারা ডান দিকের দল, কত ভাগ্যবান তারা। আর যারা বাম দিকের দল, কত দুর্ভাগা তারা। আর অগ্রবর্তীগণ তো অগ্রবর্তীই। তারাই তো নৈকট্যপ্রাপ্ত, তারা থাকবে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে।” (সুরা ওয়াকিআ, আয়াত: ৭-১২)

এই তিনটি দলের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাপূর্ণ হলো ‘আস-সাবিকুন’ বা অগ্রবর্তী দল। কারা এই অগ্রগামী মানুষ এবং কেন মহান আল্লাহ তাঁদের অন্য সবার চেয়ে আলাদা ও উচ্চতর মর্যাদা দান করেছেন, তা প্রতিটি মুমিনের জন্য এক গভীর গবেষণার বিষয়।

পরকালের তিন শ্রেণি: একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, বিচার দিবসে মানুষের আমলনামা ও অবস্থানের ভিত্তিতে যে তিনটি ভাগ করা হবে, সেগুলো হলো—

যেখানে সবাই সাধারণত ইবাদতে অলসতা করে বা কেবল ফরজটুকু পালন করে তৃপ্ত থাকে, সেখানে এই শ্রেণির মানুষগুলো সবসময় ‘খায়রাত’ বা কল্যাণমূলক কাজে সবার আগে থাকেন।

১. ডানদিকের দল: কোরআনের ভাষায় ‘আসহাবুল মাইমানাহ’। তাঁরা হলেন সেই সকল ভাগ্যবান মানুষ, যাঁরা জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আরবের সংস্কৃতিতে ‘ইয়ামিন’ বা ডান দিককে বরকত ও মর্যাদার প্রতীক মনে করা হয়। এখান থেকেই ‘মায়মানাহ’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো বরকতপ্রাপ্ত বা সৌভাগ্যবান। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, আত-তাফসিরুল মুনির, ২৭/২৪১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯১)

২. বামদিকের দল: কোরআনের ভাষায় ‘আসহাবুল মাশআমাহ’। তারা হলো দুর্ভাগা ও অশুভ এক গোষ্ঠী। “শু’ম” বা অশুভ থেকে ‘মাশআমাহ’ শব্দের উৎপত্তি। এদের অন্য নাম ‘আসহাবুশ শিমাল’ বা বাম হাতের দল। তারা হবে নরকবাসী এবং তাদের ললাটে থাকবে চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা। (সুরা ওয়াকিআ, আয়াত: ৪১)

৩. অগ্রবর্তী দল: কোরআনের ভাষায়, আস-সাবিকুন। এই দলটি পূর্বোক্ত দুই দলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য। তাঁরা কেবল বেহেশতিই নন, বরং বেহেশতের সর্বোচ্চ স্তরের অধিবাসী। তাঁদের অগ্রগামী বলার কারণ হলো, তাঁরা পুণ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন।

যেখানে সবাই সাধারণত ইবাদতে অলসতা করে বা কেবল ফরজটুকু পালন করে তৃপ্ত থাকে, সেখানে এই শ্রেণির মানুষগুলো সবসময় ‘খায়রাত’ বা কল্যাণমূলক কাজে সবার আগে থাকেন। (মুহম্মদ তাহির ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৭/২৮৫, দারুস সাহার, তিউনিসিয়া, ১৯৮৪)

আরও পড়ুন

কারা সেই অগ্রগামী দলের মানুষ

‘সাবিকুন’ বা অগ্রগামী হওয়ার প্রকৃত অর্থ নিয়ে মুফাসসিরগণের বিভিন্ন বিশ্লেষণ থাকলেও তাঁরা একটি মূল জায়গায় একমত। আভিধানিক অর্থে ‘সাবাক’ মানে হলো কোনো গন্তব্যে অন্যের আগে পৌঁছে যাওয়া। আল্লামা ইবনে আশুর ও ড. ওয়াহবাহ আল-জুহাইলির মতো পণ্ডিতগণের মতে, এই শ্রেণির মানুষেরা মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত:

প্রথমত, ১. তাঁরা হলেন সেই সব মহামানব—যাঁরা নবী ও রাসুল। ২. তাঁদের পর আছেন পরম সত্যবাদী (সিদ্দিকুন), ৩. শহীদ (শুহাদা) এবং আল্লাহর পথে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিগণ (মুহম্মদ আত-তাহির ইবনে আশুর, আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ২৭/২৮৬, দারুস সাহার, তিউনিসিয়া, ১৯৮৪)

তারা সৎকাজে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।
কোরআন, সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৬১

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উম্মত বা জাতির মধ্যে যাঁরা সর্বপ্রথম ইমান এনেছিলেন, আল্লাহর নির্দেশের সামনে প্রথম মাথা নত করেছিলেন, জিহাদে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং তওবা ও নেক কাজে বিন্দুমাত্র সময়ক্ষেপণ করেননি—তাঁরাই এই দলভুক্ত।

এঁরা কেবল নিজেরা পুণ্যবান নন, বরং ন্যায়বিচারক এবং সমাজের কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী একদল আদর্শ মানুষ। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, আত-তাফসিরুল মুনির, ২৭/২৪৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯১)

‘সাবিকুন’ নামকরণের রহস্য

মহান আল্লাহ কেন তাঁদের ‘অগ্রগামী’ বলে অভিহিত করলেন? এর উত্তরে মুফাসসিরগণ দুটি দিক নির্দেশ করেছেন। প্রথমত, ধর্মের পথে যেকোনো ত্যাগ ও কল্যাণের আহ্বানে তাঁরা ছিলেন বিদ্যুৎগতিসম্পন্ন। যেমনটি কোরআনে অন্য জায়গায় বলা হয়েছে, “এবং অগ্রবর্তী প্রথম দল—মুহাজির ও আনসারগণ।” (সুরা তাওবা, আয়াত: ১০০)

দ্বিতীয়ত, এটি শ্রেষ্ঠত্বের এক মহা-প্রতিযোগিতা। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের পুণ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা হয়েছে, “তারা সৎকাজে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৬১)

অর্থাৎ, মানুষ যখন তুচ্ছ দুনিয়াবি সার্থের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, সাবিকুনগণ তখন জান্নাতের সেই অমূল্য সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতায় নামেন যা আল্লাহ তাঁদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন।

আরও পড়ুন

কেন তাঁদের উল্লেখ সবার শেষে

সুরা ওয়াকিআর শুরুতে ডানদিকের দল এবং বামদিকের দলের বর্ণনার পর সবার শেষে ‘সাবিকুন’দের কথা আনা হয়েছে। শ্রেষ্ঠ হয়েও কেন তাঁরা শেষে? এর পেছনে রয়েছে এক চমৎকার অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ।

মহাগ্রন্থ কোরআনের বর্ণনার একটি বৈশিষ্ট্য হলো মানুষকে ধাপে ধাপে অনুপ্রাণিত করা। সূচনার আয়াতগুলোতে শাস্তির ভয়াবহতা বর্ণনা করে পাপিষ্ঠদের সতর্ক করা হয়েছে। এরপর ‘আসহাবুল মাইমানা’র বর্ণনা দিয়ে সাধারণ মুমিনদের বেহেশতের প্রতি আগ্রহী করা হয়েছে।

সবশেষে ‘সাবিকুন’ প্রসঙ্গ আনা হয়েছে যেন ‘আসহাবুল মাইমানা’র মুমিনরা নিজেদের অবস্থানেই তৃপ্ত না থাকে, বরং তারা যেন  ইবাদত ও আনুগত্য বাড়িয়ে দিয়ে সাবিকুনের উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছানোর চেষ্টা করে। (মুহাম্মদ সিদ্দিক খান, ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদিল কুরআন, ১৩/৩৭০, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)

এটি এক ধরনের পবিত্র ‘শৌখিন তৃষ্ণা’ যা মুমিনকে সর্বদা উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট রাখে।

‘আস-সাবিকুন’ বা ‘অগ্রগামী দল’  কোনো নির্দিষ্ট দল নয় এবং কোনো উপাধিও নয়, বরং এটি মুমিনের জীবনের একটি লক্ষ্যমাত্রা।

পুরস্কারের ঘোষণা: নৈকট্য ও অফুরন্ত আনন্দ

অগ্রগামীদের পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সংক্ষিপ্ত অথচ অতি শক্তিশালী একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘আল-মুকাররাবুন’ বা নৈকট্যপ্রাপ্ত।

১. নৈকট্যের স্বাদ: ‘মুকাররাব’ শব্দটি ‘কুরবাত’ থেকে এসেছে, যার অর্থ কেবল নিকটবর্তী হওয়া নয়, বরং সম্মান ও ভালোবাসার আতিশয্যে আল্লাহর আরশের ছায়ায় বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করা। রাজদরবারে যেমন রাজার অতি কাছের কিছু পারিষদ থাকে যাদের অন্য সবার চেয়ে বেশি খাতির করা হয়, জান্নাতেও সাবিকুন হবেন আল্লাহর সেই বিশেষ অতিথি। (মুহাম্মদ সিদ্দিক খান, ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদিল কুরআন, ১৩/৩৭১, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)

২. নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত: কোরআনের ভাষায়, তাঁদের আবাসস্থল হবে ‘জান্নাতুন নাঈম’। লক্ষণীয় যে, আল্লাহ এখানে ‘জান্নাতুল খুলদ’ (চিরস্থায়ী বাগান) না বলে ‘নাঈম’ (নেয়ামত বা সুখের বাগান) বলেছেন। এর অর্থ হলো, তাঁদের সেই নৈকট্য হবে কেবলই আনন্দ ও প্রশান্তির। তাঁরা কেবল আল্লাহর সান্নিধ্য ও জান্নাতের সুখ উপভোগ করবেন। (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, আত-তাফসিরুল মুনির, ২৭/২৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯১)

‘আস-সাবিকুন’ বা ‘অগ্রগামী দল’  কোনো নির্দিষ্ট দল নয় এবং কোনো উপাধিও নয়, বরং এটি মুমিনের জীবনের একটি লক্ষ্যমাত্রা। আমরা যদি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অলসতা ঝেড়ে ফেলে ইবাদত, মানুষের সেবা এবং নৈতিকতায় সামান্যতম অগ্রগামী হতে পারি, তবেই কেবল এই কাফেলায় শামিল হওয়ার আশা রাখা যায়।

সাহাবিরা নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি নির্দেশ পালনে যেভাবে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতেন, সেটিই ছিল সাবিকুন হওয়ার বাস্তব মহড়া। আধুনিক এই ভোগবাদী সমাজে আমাদেরও উচিত সেই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা—যেখানে ইবাদত হবে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, আর কল্যাণমূলক কাজ হবে আমাদের অগ্রযাত্রার বাহন।

আরও পড়ুন