হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর কথা

ছবি: এএফপি

ইসলামি ফিকহে আমরা সাধারণত চার মাজহাবের কথাই জানি—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি, হাম্বলি। তবে একটা সময় ছিল, যখন আরও বেশ কয়েকটি মাজহাব ছিল, বড় বড় আলেম ছিলেন, যারা ইসলামের শাস্ত্রীয় পরিসরে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের ‘ইজতিহাদি’ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন।

ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি লিখেছেন, হিজরি পঞ্চম শতকের আগপর্যন্ত অন্তত দশটি সুসংগঠিত মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল—সাহাবি থেকে ‘তাবে–তাবেয়ি’ পর্যন্ত প্রায় প্রত্যেক বড় আলেমেরই নিজস্ব ফকিহি অবস্থান ছিল। (সুয়ুতি, আল-হাভি লিল-ফাতাওয়ি, কায়রো, পৃ. ৩১২)

এর কারণ হলো, হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ইসলামি আইনের শাস্ত্রীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন, যাকে ‘ইজতিহাদ’ বলে, তা ছিল তখন অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক। পরে সেগুলো একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কীভাবে হলো এই বিলুপ্তি? রাজনীতি, অবহেলা, আর কখনো কখনো সরাসরি নিপীড়ন—কারণগুলো বিচিত্র। কয়েকটি মাজহাবের গল্প বলা যাক।

আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের দেওয়া বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যান করেন সুফিয়ান সাওরি এবং সরকারি চাপ থেকে বাঁচতে জীবনের শেষ দিকে আত্মগোপনে কাটান।

ইমাম আওজায়ির মাজহাব

আবদুর রহমান ইবনে আমর আল-আওজায়ি (মৃ.১৫৭ হি.) উমাইয়া আমলের সিরিয়া ও লেবাননের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফকিহ ছিলেন। মদিনার ইমাম মালিক ইবনে আনাস কখনো কখনো তাঁর মতামতকে অগ্রাধিকার দিতেন। (ইবনে আবি জুরআ আদ-দিমাশকি, তারিখু আবি জুরআ আদ-দিমাশকি, পৃ. ১৪, দামেস্ক, ১৯৮৯)

আওজায়ির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল শাসকের মুখের ওপর কথা বলার সাহস। আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলি সিরিয়া বিজয়ের পর উমাইয়া বংশের লোকদের ব্যাপকভাবে হত্যা শুরু করলে আওজায়ি সরাসরি তাঁকে বলেছিলেন এই রক্তপাত অবৈধ। (ইবনে আবি হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তাদিল, ৪/১২, হায়দরাবাদ)

অমুসলিম প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত করারোপের প্রশ্নেও তিনি শাসকদের কাছে লিখিত প্রতিবাদ জানান। ইবনে আসাকির লিখেছেন, বৈরুতে তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম ও অমুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছিল। (ইবনে আসাকির, তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৫/১২০ বৈরুত)

তাঁর মাজহাব সিরিয়া ও আন্দালুসে দীর্ঘকাল সক্রিয় ছিল। কিন্তু স্পেনের উমাইয়া শাসকেরা মালিকি মাজহাবকে একমাত্র সরকারি মাজহাব ঘোষণা করার পর আন্দালুস থেকে আওজায়ির ধারাটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সিরিয়ায়ও তাঁর কিতাবগুলো পরবর্তী প্রজন্মের শিষ্যরা যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিস্তার করেননি।

আরও পড়ুন

ইমাম লাইস ইবনে সাদের মাজহাব

লাইস ইবনে সাদ (মৃ. ১৭৫ হি.) ছিলেন মিসরের সর্বোচ্চ মর্যাদার ফকিহ ও মুহাদ্দিস। ইমাম শাফেয়ি মিসরে এসে তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞানের গভীরতা দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে লাইস ইবনে সাদ ছিলেন ইমাম মালিকের চেয়েও সূক্ষ্ম ফকিহ, কিন্তু তাঁর শিষ্যরা তাঁকে হারিয়ে ফেলেছেন। (আবুশ শাইখ আল-আসফাহানি, তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন বি-আসফাহান, ২/১৫, কায়রো)

লাইস ইবনে সাদ সচ্ছল মানুষ ছিলেন, নিজের গ্রন্থের অনুলিপি নকল করার জন্য লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর শিষ্যরা মূল বক্তব্যগুলো সংকলন করলেও নতুন মাসআলায় সেগুলো প্রয়োগ করার মতো যোগ্যতা দেখাতে পারেননি।

ফিকহে যাকে বলে ‘তাফরি’ বা শাখা-প্রশাখা বিস্তার—সেই কাজটি না হওয়ায় মাজহাবটি একটি স্থবির সংকলনে পরিণত হলো এবং ধীরে ধীরে পাঠকশূন্য হয়ে গেল।

ইমাম তাবারির মাজহাব

তাফসিরে তাবারির লেখক আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি (মৃ. ৩১০ হি.) শুধু যে একজন মুফাসসির ছিলেন, তা নয়—তিনি একজন স্বাধীন মুজতাহিদও ছিলেন, যাঁর নিজস্ব মাজহাব ‘জারিরি মাজহাব’ নামে পরিচিত ছিল এবং বাগদাদে তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অনুসারী ছিলেন।

ফিকহের কিছু প্রশ্নে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে তাবারির মতভেদ ছিল। বাগদাদের একটি অংশ এই মতভেদকে ব্যক্তিগতভাবে নেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রটানো শুরু হয়।

তাঁর পতনের কারণ ছিল রাজনৈতিক। ফিকহের কিছু প্রশ্নে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে তাঁর মতভেদ ছিল। বাগদাদের একটি অংশ এই মতভেদকে ব্যক্তিগতভাবে নেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রটানো শুরু হয়। ইতিহাস গ্রন্থগুলিতে, বিশেষ করে তারিখু বাগদাদ–এ এই বিবাদের বিস্তারিত বিবরণ আছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি কার্যত গৃহবন্দী অবস্থায় ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে রাতের বেলায় নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়—কারণ জানাজায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছিল। এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাঁর মাজহাবের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে দেয়।

সুফিয়ান সাওরি ও আবু সাওরের মাজহাব

সুফিয়ান সাওরি (মৃ. ১৬১ হি.) ছিলেন কুফা নগরীর খ্যাতিমান ইমাম এবং অসাধারণ জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ স্বাধীনচেতা মেজাজের জন্য পরিচিত। আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের দেওয়া বিচারপতির পদ তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং সরকারি চাপ থেকে বাঁচতে জীবনের শেষ দিকে আত্মগোপনে কাটান। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭/১৭৭, বৈরুত, ১৯৮৫)

ফলে তাঁর ফকিহি কাজকে কেন্দ্র করে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারা গড়ে ওঠেনি।

আরও পড়ুন

আবু সাওর আল-বাগদাদি (মৃ. ২৪০ হি.) ছিলেন ইমাম শাফেয়ির শিষ্য, যিনি পরে নিজস্ব একটি পদ্ধতিতে ফিকহচর্চা করেন। তাঁর মাজহাবের অনুসারী ছিলেন মূলত ককেশাস অঞ্চলে। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মে এই ধারা টিকিয়ে রাখার মতো সংগঠিত চেষ্টা হয়নি।

জাহিরি মাজহাব

বিলুপ্ত মাজহাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছিল জাহিরি মাজহাব। প্রতিষ্ঠাতা দাউদ ইবনে আলি আল-আসফাহানি (মৃ. ২৭০ হি.)। এই মাজহাবের মূল অবস্থান ছিল—ফিকহে কিয়াস বা যুক্তিভিত্তিক অনুমানের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়, কোরআন ও সুন্নাহর সরাসরি ও বাহ্যিক অর্থই চূড়ান্ত।

এই মাজহাবকে সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ দিয়েছিলেন স্পেনের আলেম ইমাম ইবনে হাজাম আন্দালুসি (মৃ. ৪৫৬ হি.)। তাঁর আল-মুহাল্লাআল-ইহকাম শিরোনামের দুটি গ্রন্থ তুলনামূলক ফিকহের কিতাব হিসেবে আজও স্বীকৃত।

ইমাম জাহাবি লিখেছেন, হিজরি অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত জাহিরি মাজহাবকে পঞ্চম প্রধান মাজহাব হিসেবে গণ্য করা হতো। (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১৩/১০৩, বৈরুত, ১৯৮৫)

তবে ইবনে হাজামের লেখার ধরন ছিল অত্যন্ত ধারালো ও সরাসরি—প্রতিপক্ষের মত খণ্ডনে তিনি কোনো রাখঢাক করতেন না। এই স্বভাবের কারণে সমসাময়িক মালিকি আলেমদের সঙ্গে তাঁর তিক্ততা হয় এবং উত্তর আফ্রিকার কয়েকজন শাসকের আমলে তাঁর কিতাব নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে মাজহাবটি সংগঠিত থাকতে পারেনি।

আব্বাসীয় ও পরে ওসমানীয় আমলে হানাফি মাজহাব এবং কিছু অঞ্চলে শাফেয়ি মাজহাবের আলেমরা প্রধান বিচারপতির পদ পেয়েছেন—ফলে ছাত্ররা সেই মাজহাব পড়তে বেশি উৎসাহী হয়েছেন।

মাজহাবগুলো বিলুপ্তির ৩ কারণ

এই ইতিহাসের দিকে তাকালে তিনটি কারণ বারবার সামনে আসে।

প্রথমত, লিখিত ও সংগঠিত রূপের অভাব। একটি মাজহাব টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠাতার মূল বক্তব্য থাকলেই হয় না—পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের সেটিকে নতুন প্রশ্নে প্রয়োগ করতে হয়, অধ্যায়ভিত্তিকভাবে সাজাতে হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য সুলভ করতে হয়। লাইস ইবনে সাদের মাজহাবের ক্ষেত্রে এই কাজটি হয়নি বলেই সেটি হারিয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক। আব্বাসীয় ও পরে উসমানীয় আমলে হানাফি মাজহাব এবং কিছু অঞ্চলে শাফেয়ি মাজহাবের আলেমরা প্রধান বিচারপতির পদ পেয়েছেন—ফলে ছাত্ররা সেই মাজহাব পড়তে বেশি উৎসাহী হয়েছেন। যে মাজহাবের পেছনে রাষ্ট্রীয় কোনো সংযোগ নেই, সেটি ধীরে ধীরে পাঠকশূন্য হয়েছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সামাজিক বয়কট। ইমাম তাবারির জীবন এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণ।

এই মাজহাবগুলো সাংগঠনিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি। ইমাম ইবনে রুশদের বিদায়াতুল মুজতাহিদ বা ইবনে কুদামার আল-মুগনির মতো তুলনামূলক ফিকহের কিতাবগুলো এই বিলুপ্ত মাজহাবের মতামত সংরক্ষণ করেছে।

আধুনিক ফিকহ-গবেষকেরা আজও সেই উৎস থেকে কাজ করেন। একটি মাজহাব হারিয়ে গেলেও একজন মুজতাহিদের চিন্তা কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না।

আরও পড়ুন