অধুনা বস্তুবাদী দুনিয়ায় মানবসমাজের যে অংশটি সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, তারা ‘প্রতিবন্ধী’ হিসেবে পরিচিত। সমাজের এই স্তরে সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়, যাঁরা সময়ের গতিধারা ও জীবনের দৌড়ে নিজেদের শারীরিক, স্থায়ী বা জন্মগত সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়েছেন।
প্রতিবন্ধীদের প্রতি দয়া ও মায়া প্রদর্শন করা মানবিকতার দাবি। ইসলাম প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে এবং ইসলামি আইনের (ফিকহ) একটি বড় অংশ তাঁদের অধিকার সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক অধিকার
ইসলাম প্রতিবন্ধীদের ওপর কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেয়নি এবং তাঁদের কঠোর জীবিকা উপার্জনের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত রেখেছে। পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াত এবং হাদিসে দুর্বল ও অসহায়দের সঙ্গে সদাচরণ ও তাঁদের জন্য ব্যয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রতিবন্ধীরাও সেই নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।
ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবগুলোতে ‘নিকটাত্মীয়দের ভরণপোষণ’ শিরোনামে যে বিবরণ রয়েছে, তার মূল কথাই হলো প্রতিবন্ধীদের জীবন ও জীবিকায় স্বজনদের সহযোগিতা করা।
খলিফা ওমর (রা.) এক বৃদ্ধ অন্ধ লোককে ভিক্ষা করতে দেখেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন, তিনি একজন ইহুদি নাগরিক। খলিফা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে এই অবস্থায় কে পৌঁছে দিয়েছে?’
আল্লামা কাসানি (রহ.) লিখেছেন, ‘পরিবারের কোনো দরিদ্র আত্মীয় যদি পঙ্গু, অসহায়, প্রতিবন্ধী, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন, অন্ধ কিংবা হাত-পা কাটা বা অবশ হয়, তবে ফিকহি ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী পরিবারের অন্যান্য সুস্থ ও সামর্থ্যবান আত্মীয়ের ওপর তাদের ভরণপোষণ ওয়াজিব।’ (আলাউদ্দীন আল-কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিবিশ শারায়ে, ৪/৪৪৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ২০০৩)
শুধু পরিবারে নয়; ইসলামের স্বর্ণযুগে তাঁদের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা ছিল। খলিফা ওমরের যুগে সাধারণ রাষ্ট্রীয় আদেশ ছিল যে দেশের যত পঙ্গু, অক্ষম ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি আছে, সবার ভাতা যেন বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে নির্ধারণ করা হয়।
লাখের বেশি মানুষ সামরিক দপ্তরে তালিকাভুক্ত ছিল, যারা ঘরে বসেই খাদ্যসামগ্রী পেত। ধর্মনির্বিশেষে নির্দেশ ছিল যে বায়তুল মাল থেকে তাঁদের জন্য দৈনিক ভাতা বরাদ্দ করতে হবে। (আল্লামা শিবলি নোমানি, আল-ফারুক, ২/১৯৬-১৯৭, মাকতাবাতুল ইসলামিয়াহ, লাহোর, ১৯৪৪)
খলিফা ওমর (রা.) এক বৃদ্ধ অন্ধ লোককে ভিক্ষা করতে দেখেন। খোঁজ নিয়ে জানলেন, তিনি একজন ইহুদি নাগরিক। খলিফা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে এই অবস্থায় কে পৌঁছে দিয়েছে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘জিজিয়া (কর), অভাব ও বার্ধক্য।’
ওমর (রা.) তাৎক্ষণিক তাঁর হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিলেন। এরপর তিনি বায়তুল মালের কোষাধ্যক্ষকে ডেকে বললেন, ‘এই ব্যক্তি ও এর মতো অন্যদের দিকে বিশেষ খেয়াল করো। আল্লাহর কসম, এটা ইনসাফ নয় যে আমরা তাঁর যৌবনের উপার্জন ভোগ করব আর বার্ধক্যে তাঁকে তাড়িয়ে দেব।’
তিনি ওই ব্যক্তি ও তাঁর মতো অন্য অমুসলিম প্রতিবন্ধীদের জিজিয়া থেকে অব্যাহতি দিলেন। এমনকি তিনি যখন দামেস্কে সফর করছিলেন, তখন কুষ্ঠরোগাক্রান্ত একদল খ্রিষ্টানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নির্দেশ দিলেন যেন জাকাত ও সাধারণ ফান্ডের খাত থেকে তাঁদের আর্থিক সাহায্য করা হয় এবং তাঁদের জন্য নিয়মিত রেশনের ব্যবস্থা করা হয়। (সাইয়িদ কুতুব, আল-আদালাতুল ইজতিমায়িয়া ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ৩৭৮, দারুশ শুরূক, কায়রো, ১৯৯৩)
সামাজিক ও অর্থনৈতিক লেনদেনে প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষায় রাসুল (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল। এক সাহাবির দৃষ্টিশক্তি কম ছিল এবং মানসিক বিকাশেও কিছুটা ঘাটতি ছিল, যার ফলে কেনাবেচায় তিনি প্রায়ই প্রতারিত হতেন।
পরিবারের কোনো দরিদ্র আত্মীয় যদি পঙ্গু, অসহায়, প্রতিবন্ধী, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন, অন্ধ কিংবা হাত-পা কাটা বা অবশ হয়, তবে ফিকহি ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী পরিবারের অন্যান্য সুস্থ ও সামর্থ্যবান আত্মীয়ের ওপর তাদের ভরণপোষণ ওয়াজিব।আল্লামা আলাউদ্দীন আল-কাসানি (রহ.), বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিবিশ শারায়ে
নবীজি তাঁর ও তাঁর মতো ব্যক্তিদের জন্য কেনাবেচায় ‘খিয়ারে শর্ত’ (শর্তযুক্ত অধিকার) প্রবর্তন করেন, যার ফলে বিক্রেতা বা ক্রেতা কেনাবেচা চূড়ান্ত করার পরও তা বাতিলের জন্য তিন দিনের সুযোগ পান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১১৭)
সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা
আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) ছিলেন একজন অন্ধ সাহাবি। একবার তিনি নবীজির দরবারে একটি ধর্মীয় সমাধান জানতে আসেন এমন সময়, যখন নবীজি কোরাইশ বংশের বিশিষ্ট নেতাদের সঙ্গে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে কথা বলছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁর এই অসময়ের প্রশ্ন করাকে কিছুটা অপছন্দ করলেন। ঠিক তখনই সুরা ‘আবাসা’ নাজিল হয়, যেখানে নবীজির এই সাময়িক আচরণের ওপর মৃদু অনুযোগ করা হয়।
বর্ণনায় আছে, এর পর থেকে যখনই ওই অন্ধ সাহাবি নবীজির দরবারে আসতেন, তিনি তাঁকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করতেন এবং নিজের চাদর বিছিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘স্বাগতম সেই সাথিকে, যার ব্যাপারে আমার প্রতিপালক আমাকে সতর্ক করেছেন।’ (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৮/৩২১, দারু তাইবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)
রাসুল (সা.) যখন ওহুদ যুদ্ধের জন্য মদিনা থেকে রওনা হন, তখন নিজের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে এই অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকেই মদিনার প্রশাসনিক ও নামাজের ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে যান। (সুনানু আবি দাউদ, হাদিস: ২৯৩১)
একজন দৃষ্টিহীন ব্যক্তির ওপর এত বড় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন নবীজি। এমনকি একজন কুষ্ঠরোগীকেও তিনি নিজের সঙ্গে একই দস্তরখানে খাবারে শরিক করেছেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৫৪২)
সাইদ ইবনে ইয়ারবু (রা.) নামের একজন সাহাবি বার্ধক্যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন। খলিফা ওমর তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি জুমায় আসেন না কেন?’ তিনি বললেন, ‘আমার কোনো লোক নেই যে আমাকে রাস্তা দেখিয়ে মসজিদে নিয়ে যাবে।’
হজরত ওমর (রা.) তাৎক্ষণিক রাষ্ট্রীয় খরচে একজন লোক নিযুক্ত করে দিলেন, যে সর্বদা তাঁর পথপ্রদর্শক হিসেবে সঙ্গে থাকত। (শিবলি নোমানি, আল-ফারুক, ২/২০৫)
ধর্মীয় অধিকার ও শিথিলতা
শারীরিক শ্রম ও কষ্টসাধ্য অনেক ইবাদত থেকে ইসলাম প্রতিবন্ধীদের হয় সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে অথবা সহজ বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে। জুমা ও জামাতে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে প্রতিবন্ধীরা মুক্ত। সম্পদশালী কিন্তু পঙ্গু ও অক্ষম হলে হজের পরিবর্তে ‘হজে বদল’ এবং রোজার পরিবর্তে ‘ফিদইয়া’র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রতিরোধ বা জিহাদের মতো কঠিন দায়িত্ব থেকেও তাঁদের আইনি অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অন্ধের জন্য কোনো পাপ নেই, পঙ্গুর জন্য কোনো গুনাহ নেই এবং অসুস্থের জন্য কোনো পাপ নেই।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১৭)
এমনকি সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে যাঁরা শারীরিক অক্ষমতার কারণে ঘরে বসে আছেন, তাঁরাও নিয়তের কারণে ময়দানের যোদ্ধাদের সমান সওয়াব পাবেন।
তাবুক যুদ্ধের সময় নবীজি (সা.) মুজাহিদদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তোমাদের পেছনে মদিনায় এমন কিছু লোক আছে যে তোমরা যে উপত্যকাই অতিক্রম করো এবং যে পথেই চলো, তারা সওয়াবের ক্ষেত্রে তোমাদের সমান অংশীদার।’
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তারা মদিনায় বসে থেকেও কীভাবে শরিক হবে?’ তিনি বললেন, ‘অক্ষমতা ও অসুস্থতা তাদের আটকে রেখেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯১১)
সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য শক্তিশালী সামাজিক কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অপরিহার্য।
যুদ্ধকালীন অধিকার
ইসলামের আবির্ভাবের আগে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিগ্রহে যোদ্ধাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো পার্থক্য করা হতো না। শত্রু জাতির প্রত্যেক ব্যক্তিকে অবলীলায় হত্যা করা হতো। নারী, শিশু, বৃদ্ধ বা বিকলাঙ্গ—কেউই রেহাই পেত না।
ইসলাম এ ক্ষেত্রে প্রথম বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করেছে—১. প্রত্যক্ষ যোদ্ধা এবং ২. সাধারণ অসামরিক নাগরিক। ইসলাম প্রথম শ্রেণির ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণের অনুমতি দিলেও দ্বিতীয় শ্রেণির শান্তিকামী ব্যক্তি—যেমন নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, অন্ধ ও বিকলাঙ্গদের হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।
আজ যারা বিশ্বমঞ্চে প্রতিবন্ধীদের অধিকারের প্রবক্তা ও তথাকথিত দাবিদার, সেই পরাশক্তিগুলো নিজেদের ক্ষমতার মোহে শুধু প্রতিবন্ধীসহ জনপদ ধ্বংস করছে না; বরং আধুনিক ও ধ্বংসাত্মক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বংশপরম্পরায় নতুন নতুন প্রতিবন্ধী তৈরির পথ সুগম করছে।
তা ছাড়া সমাজের এই অংশটি যতটা সহমর্মিতা ও মনোযোগ পাওয়ার কথা, বর্তমানে তারা কার্যত ততখানি বঞ্চনার শিকার। সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য শক্তিশালী সামাজিক কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অপরিহার্য।